আয়না

অপূর্ব সাহা



(১)

মৃণাল ঘরের দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিলো, মনিদীপা ড্রেসিং টেবিলে বসে হাতের চুড়ি গুলো খুলে রাখছে । প্রফুল্ল চিত্তে মৃণাল এসে দাঁড়ায়ে মনির পাশে । 

“ কথা আছে। ” কমনীয়তার থেকে দমনীয়তার ঝাঁজ বেশী ঠেকলো বউয়ের গলায়। একটু অবাক হলো বললে কম বলা হবে। সামান্য বিরক্তি জন্মাল মনের কোণে । বৌ তার আধুনিকা, ইস্কুলে পড়ায় । তাই বলে ফুলসজ্জার রাতে, এমন গম্ভীর! তা তো আগে দেখা করার সময় মনে হয় নি। রাত গভীর, একটি প্রাণী কথা কয়, অন্যটি শোনে। রাত ভোর হবার আগেই দুজনে ঢুলে পড়ে অগাধ ঘুমে। 

দিন আসে, দিন যায়। মৃণাল আর মনি তাদের  চাকরি বাকরি সামলাতে সামলাতে সংসার গোছাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বিজয়া হাঁটুর ব্যাথায় কুপোকাত। মাঝে মাঝেই বউমাকে বলে, “ মনি নাতি নাতনির মুখ কবে দেখাবি ? এই ব্যাথায় ব্যথায় ক ‘ দিন বেঁচে থাকবো কে জানে?” মনি হাসে, কোন উত্তর দেয় না । সুবাস খাওয়া শেষ করে টেবিল থেকে ওঠে। 

আজকালকার সরকারি অফিসেও কাজের চাপ অনেক বেশী ।  মানে শুধু দৌড়ান, মাঝে বিরাম কোন কিছুর নেই। এরই ফাঁকে টুকটাক শশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করে আসে, নতুন বর-বউ।  সবাই বলে, ‘খুব মানিয়েছে তোদের’ । মৃণাল-মনির সম্পর্কের বাঁধন, সময়ের তালে তালে দুলে চলে। মৃণাল জানে ওর হাতে বেশী সময় নেই ।ওদের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে মনির পাশ বালিশ। 

(২)

খাবার টেবিলে থালায় থালায় ভাত বেড়ে দেয় বিজয়া। সামান্য ডাল, কুমড়োর ঘন্টো আর ডিম ভাজা। সবাই নিঃশব্দ । ওরা তিনজন। ঝড়ের পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিল মৃণাল। কোন কাজ হয় নি। বিজয়া, সুবাস মনে মনে মরে গেছে। মনিকে খুব ভালবেসে ছিল যে। মেয়েটা এরকম করতে পারে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি। মৃণালের কথাকে প্রথমে হাসি  মেরে উড়িয়েই দিয়েছিল সুবাস। পরে ভুল বুঝতে পেরে, মনিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, সবই বৃথা। বিয়ে টিকলো  মেরেকেটে দেড় বছর। আইন আদালতের কাছে যায় নি , কেউই। মিউচুয়ালি সেপারেটেড। 

প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। 

ওদের ছাড়াছাড়ির এক মাসের মাথাতেই নাকি, কৌশিকের সাথে বিয়ে করেছে মনি। মৃণালই খবরটা এনেছিল, মনির সহকর্মী বংশীর কাছ থেকে। বংশী বলেছে, সামনের মাসে, এই ইস্কুল ছেড়ে দেবে মনিদীপা। 

সুবাস আর বিজয়া একবারটি শুধু দেখা করতে চেয়েছিল।  মৃণাল মানা করেছে। কি দরকার, নিজেদের সম্মান খুইয়ে ? পাড়া প্রাতিবেশী থেকে আত্মীয়স্বজন সবাই মনে মনে মৃণালের দোষ দেখে। কেউ কেউ আবার ওর পৌরুষত্ত্ব নিয়ে কথা বলতেও  ছাড়ে না। 

সময় বড়ো বলবান। দিন আসে, দিন যায়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে চৌধুরী পরিবার। মা বাবাকে এখানে একা রেখে, মৃণাল বিদেশের চাকরির প্রস্তাবটা নিল না। অফিসের কাজ, সন্ধ্যায় ঠিক সময় বাড়ি ফিরলে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক বেড়াতে যাওয়া। বেশ কেটে যাচ্ছে জীবন। 

সামনের মাসের তেইশ তারিখ ওদের বিবাহ বিচ্ছেদের চার বছর পুরো হবে। কেউ জানুক না জানুক, প্রতি মাসের তেইশ তারিখ, মৃণালের চোখে ঘুম আসে না, বালিশের কোণা ভিজে যায়। আজও বড্ডো ভালবাসে মনিকে। 

(৩)

রাসবিহারীর উপরে এই  বার-কাম-রেস্তরাঁটা মৃণালের চেনা। অফিস থেকে ফেরার পথে মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে। ঘড়িতে পৌনে আটটা বেজে গেছে। বৃষ্টি ধরার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কাল রবিবার, ছুটি, তাই মৃণাল রেস্তরাঁর কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে পা বাড়ালো। বৃষ্টির সন্ধ্যা বলেই বোধহয়, অফিস ফেরত বাবুরা  ভিড় করেছে। ফাঁকা টেবিল তো চোখে পড়ছে না। কোণার দিকে একটাই চেয়ার খালি। জোরে পা চালায় মৃণাল। নয়তো , ওটাও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। টেবিলটা ছোট। উল্টো দিকের চেয়ারে শাড়ি পড়া এক ভদ্রমহিলা বসে। মাথাটা পিছন দিকে হেলানো, চোখ বোজা আর হাত দুটো হালকা করে টেবিলের উপর  রেখেছেন। ভালো করে তাকিয়ে দেখলে বোঝা গেলো, দিন শেষের ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে ভদ্রমহিলাকে। নাহ, এই ভাবে তাকানো ঠিক নয়। 

বেয়ারাকে ডেকে মৃণাল চা আর দুটো গ্রিল্ড স্যান্ডুইচ আনতে বললো। ভদ্রমহিলার দিকে একবার তাকিয়ে, বেয়ারা চলে গেলো। 

‘ তুমি?’

মোবাইল থেকে মুখ তুলে চেয়ে দেখে মৃণাল। অল্প হাসে। মনিদীপা দাঁতে দাঁত  চেপে বলে, ‘ সিন ক্রিয়েট কোরো না এখানে’

‘ বোসো। তুমি উঠে গেলেই বরং লোকে কিছু ভাববে।‘

‘ লোক ! আই ডোন্ট কেয়ার, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?’

শব্দ গুলো নীরবে হজম করে মৃণাল। ‘ চা আর স্যান্ডুইচ অর্ডার দিয়েছি। বোসো। তোমার জন্য বিনা চিনির ব্ল্যাক কফি’ 

পাঁচ মিনিটের নীরবতা। বেয়ারা চা কফি আর খাবার দিয়ে যায়। 

‘ এদিকে ?’

‘স্কুলে ছুটির  পর বন্ধুর বাড়ি এসেছিলাম’

মৃণালের ক্ষিদে পেয়েছে খুব। আর অপেক্ষা না করে স্যান্ডুইচে কামড় বসায়। মনিদীপা আড় চোখে দেখে ও দেখে না। কফির কাপ হাতে তুলে নেয়। ‘ উহ বড্ডো গরম।‘ মৃণাল সোজা তাকায় খাবারের দিকে ইশারা করে।

‘বিয়ে করেছ? বৌ কি করে?’

এইরকম প্রশ্ন আশা একেবারেই করে নি মৃণাল। আচমকা ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠে ও। ‘ করেছি। বাড়িতেই থাকে।‘

মনিদীপাকে একটু স্বাভাবিক লাগে।  ঈষৎ হেসে বলে ‘ছবি দেখাও’। 

‘ আরে ছবি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াবো নাকি? আর জানবোই বা কি করে তোমার সাথে দেখা হবে আর তুমি আমার বৌয়ের ছবি দেখতে চাইবে। ‘ চায়ের কাপ হাতে তুলে নেয় মৃণাল। 

‘ আমিই তো প্রশ্ন করে যাচ্ছি। ‘ 

‘আর আমি উত্তর দিচ্ছি।  আচ্ছা বলো তোমার খবর , শুনি।‘

মনিদীপার দুচোখ বেয়ে জলের ধারা। মুখটা বাইরের রাস্তার দিকে ঘুরিয়ে নিলো মনি। 

‘ একি ? আমি কি দুঃখ দিলাম। সরি । মনি প্লিজ, আমি সেভাবে………’

‘ নাহ তুমি কেন দুঃখ দেবে? আমারই অদৃষ্ট। কৌশিকের সাথে বিয়ের ছয় মাসের মাথায় কার এক্সিডেন্ট। ওকে হাসপাতালেও নিয়ে যেতে পারিনি। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি জোরে চলছিল। টায়ার ফেটে গাড়িটা রাস্তার পাশে গাছে ধাক্কা লেগে উল্টে  যায় । ওর দিকটা চুরমার হয়ে গেছিল। ……।‘

মনিদীপা যেন স্মৃতির পাতার প্রতিটা অক্ষর মেলে ধরলো মৃণালের সামনে। আরও জানালো, বাবা মার কাছেই থাকে। নতুন ইস্কুলে  চাকরি করছে। নিজেকে ধীরে ধীরে সামলে নেয় মনিদীপা। পরে প্রাক্তন শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের খবর নেয় এক্স-বরের কাছ থেকে। সৌজন্য দেখিয়ে মৃণাল ও সবার কথা জানায়। 

মৃণালের মনে একটা কথাই খচখচ করে। মনি গাড়ি চালাচ্ছিল বলে, বরের বাৎসরিক কাজ করতে শ্বশুরবাড়িতে ওকে ঢুকতে পর্যন্ত দেয় নি। আপনা হতেই দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। 

কোন কথাই শুনলো না মৃণাল। এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় একা ছাড়লো না মনিকে।  মনির বাড়ীর কাছে মোড়ের মাথায় ছেড়ে দিলো। বৃষ্টি বেশ কিছুক্ষণ হলো ধরে এসেছে। গাড়ির গতি বাড়ায় মৃণাল। পাড়াটা ওর বড্ডো চেনা যে। 

বাড়ি এসে সামান্য কিছু খেয়ে শুয়ে পড়লো। কাউকে কিছু বললো না। মনের আয়নায় মনির মুখ ভাসতে থাকে।     

(৪)

সান্যাল পরিবার বরাবরই শান্তিপ্রিয়। ছেলে মেয়ে চাকরি করে। সমীরবাবু কলেজে পড়ান। স্ত্রী, রেবতী একটি স্কুলে পড়াতো, বছর  দুয়েক হলো স্বেচ্ছাবসর নিয়েছে। অনেক দিন তো হলো, চাকরির। অর্থের প্রয়োজনে চাকরির দরকার আর নেই। সমীরবাবুও বার বার বলছিলেন, এবার একটু বিশ্রাম নাও। ব্যাস আর কি। সকাল থেকে বউমাকে রান্নাতে একটু সাহায্য করা। টুকটাক পত্রিকা বই পড়া, এতেই সময় কেটে যায়, রেবতীদেবীর। বউমা, বাড়ির কাছেই ইভিনিং কলেজে পড়ায়। পাড়ার লোকজন ঠাট্টা করে বলে স্কুল পরিবার। 

আজ, শনিবার । সবার ছুটি। ছেলে শৌনক কলকাতার বাইরে গেছে বন্ধুদের সাথে। শুধু মেয়ের অফিস আছে। টিংটং। এই বুঝি এলো। শেবন্তী আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দরজা খুলে দিলো। 

‘আসতে পারি’ সৌম্য দর্শন ভদ্রলোকটি একগাল চাপা দাড়ি আর কালো সান গ্লাসের ভিতর থেকে বলল। 

কি করবে না করবে, ভেবে না পেয়ে অগত্যা একদিকে সরে জায়গা করে দেয়। মনে মনে চিন্তা করে, মা বাবা তো আছে? ভয় কিসের? দেখে তো ভালো মানুষই মনে হচ্ছে। ভিতরে এসে, শু র‍্যাকের পাশে জুতা খুলে সামনের চেয়ারে বসে পড়েন ভদ্রলোক। 

‘একটু জল দেবেন?’

‘ হ্যাঁ’ সম্বিত ফিরে পায় শেবন্তী। এতক্ষণে রেবতীদেবী বেরিয়ে আসেন। ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ায়। 

‘একটু শুনবে’ স্বামীকে ডাকেন রেবতী। 

ভদ্রলোক রেবতীদেবী আর সমীরবাবুকে প্রণাম করে আবার চেয়ারে বসলেন। শেবন্তী জল দিয়ে চলে গেছে ভিতরে। রেবতী ও ওকে ডাকেন নি। কিন্তু, ও ভিতর থেকে বুঝতে পারে, সবাই চুপচাপ। কে  এই ভদ্রলোক? কেউ কোন কথা বলছে না কেন? একটু কি আন্দাজ করতে পারছে ? নাহ ! যা ভাবছে তা হতে পারে না। তাহলে, ননদ ওকে নিশ্চয়ই কিছু জানাতো। 

এ কথা সে কথার পর, রেবতী উঠে গেলেন, রান্না ঘরের দিকে। শেবন্তী ও তর তর করে উৎসাহ নিয়ে মায়ের কাছে গেলো। মায়ের মুখ গম্ভীর। যা ভেবেছে তাই। ননদের আগের স্বামী,  মৃণাল চৌধুরী । গা জ্বলে যায় । এখন কি কম্মে আসা? কে জানে ? 

‘ আমি কিন্তু খুব আঘাত পেলাম। মনি বলে নি, তা বুঝি।  তাই বলে, আপনারা ও আমাকে জানালেন না। আমি এতোটাই পর হয়ে গেছি?’

সমীরবাবুকে, এতো গম্ভীর এতো চুপচাপ দেখেনি শেবন্তী। ধীর পায়ে, খাবার টেবিলে লুচি আলুর দম আর মিষ্টি রেখে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। রেবতী অনেক টা সামলে নিয়েছে। ‘ এসো বাবা, একটু খেয়ে নাও’ 

কৌশিক মারা যাবার, নয় মাসের মাথায় , মননের সাথে শেবন্তীর বিয়ে হয়। তাই, বাড়িতে জামাই আদর ব্যাপারটা, আজ ই প্রথম দেখলো। খাবার টেবিলে আয়োজন বেশী নেই। কিন্তু, মা যেন, আজ প্রাণ ভরে খাওয়াচ্ছেন। বাবা ও এসে টেবিলে বসলেন। 

মৃণাল বাবু ও বেশ আয়েশ করে খাচ্ছেন। শেবন্তী, মনে মনে ভাবে, কি মানুষ রে বাবা। এক্স বউয়ের বাড়িতে এসে গোগ্রাসে গিলছে। কোন মান সম্মান নাই ? যাক গে। 

‘ এই কথায় কিন্তু মানা করতে পারবেন না।‘ 

‘ আমাদের কি আর কথা বলার মুখ আছে?’

‘ এ ভাবে বলবেন না’

‘ দেখো। আমরা তো কতো বুঝাবার চেষ্টা করলাম। মনি গোঁ ধরে বসে আছে, আর বিয়ে করবে না একাই থাকবে। আমরা কি আর চিরকাল থাকবো।‘ বলেই  রেবতী চোখের জল মোছেন। 

(৫)

দোতলায় মনির ঘরটা এক রকম ই আছে। দেওয়ালে যেখানে ওদের দুজনের ছবি টাঙ্গানো ছিল, জায়গাটা ফাঁকা। মনটা দুলে ওঠে মৃণালের। কৌশিকের কোন ছবি দেখা যাচ্ছে না । হয়তো মনে কষ্ট হয়, তাই সামনে রাখে নি মনিদীপা। বিছানায় একটা মাথার বালিশ, একটা পাশবালিশ। আজো তারমানে, মনি এক ই রকম আছে। পশ্চিমের জানালা দিয়ে বিকালের পড়ন্ত রোদ ঢুকতে শুরু করেছে। সিঁড়িতে চটির আওয়াজ। মৃণাল আপন মনে জানালার পাশে বসে থাকে, দরজার সোজাসুজি। দরজার বাইরে থেকে  মনিদীপা ঘাড় ঈষৎ বাম দিকে ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে মৃণালের উপর। মৃণাল নিরুত্তাপ। হালকা হাসে। ঘরে ঢুকে হাতের ব্যাগটা বিছানায় রেখে মনিদীপা ভ্রূ কুঁচকে  মৃণালের সামনে দাঁড়ায়, চোখে মুখে প্রশ্নচিহ্ন স্পষ্ট। 

‘ কি চাই?’

‘কিছু না’

; তাহলে?’

‘এমনি’

‘ এমনি এমনি আসার মানুষ তো তুমি নও মৃণাল। এটা তোমাকে শোভা পায় না।‘

‘ কি শোভা পায় না? তুমি কি ভাবছো আমি কোন সুযোগ নিচ্ছি মনি?’

‘ আমি কি বলতে চাই তুমি ঠিকই বুঝতে পারছো।‘

‘ না মনি, আমি বুঝতে পারছি না একটু বুঝিয়ে বলবে আমায়’

মনিদীপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এক অপরিচিত অবস্থার মধ্যে নিজে জড়িয়ে পড়ছে। জেনে ও যেন, বেড়িয়ে আসতে  পারছে না। চেয়ারে এসে বসে।

‘ মা বাবার কথাটা একবার ভেবে দেখো’

‘ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা তোমরা বোঝার চেষ্টা করো না কেন? মেয়ে বলে কি একা থাকতে পারবো না? তোমাদের বাধ্য কেন বানাতে চাও আমাদের?’ 

‘ তুমি এখনো পাশ বালিশ নিয়ে ঘুমাও?’ প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করে মৃণাল।

‘ না। এমনি আছে।‘ হালকা উত্তর দেয় মনি।

ধীরে ধীরে মৃণাল চেয়ারের পিছনে এসে দাঁড়ায়ে। 

‘ তোমাকে ছেড়ে এসেছি। কৌশিককে ঈশ্বর টেনে নিলেন। আবার বাবা কাউকে ধরে আনবে।  আমি কারো ও গলগ্রহ হয়ে থাকতে পারবো না, সেটা নিশ্চয় জানো তুমি? ‘ কেটে কেটে কথা গুলো বল লো, মনি। এক দৃষ্টে চেয়ে আছে মেঝের দিকে। 

‘ তোমার স্বাধীনচেতা মন কে আমি জানি মনি। আজ তোমার বাড়ি আসাটা সবাই অন্য চোখে দেখতেই পারে , তুমি ও তাই ভাবছো? তোমার কথা তো শুনলাম, এবার আমার কথা শোনো’

‘ কোন কথা     ‘ চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে থমকে গেলো মনি। 

বিবাহিত জীবনে মৃণাল যা করে নি, আজ তাই করলো। মনির কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠতে দিলো না মনিকে। মনির পাতার পলক পাড়ে না। ঠিক যেন পাঁচ বছর আগের দিন। নববধূর পিছনে মৃণাল দাঁড়িয়ে। সেদিন মানা করেছিলো। আজ ভিতর থেকে কে যেন মনিকেই মানা করে দিলো , কথা না বলতে। 

‘ মনি, আমাদের সবার কথা একবার ভাবো। নতুন করে কাউকে খুঁজতে হবে না। আমি তো আছি। আমার বউয়ের কষ্ট আমি কমাতে পারি না?’

জোরে জোরে ঘাড় নাড়ে মনি,’ না তা কোন দিন ই হয় না। ও বাড়িতে আমার স্থান নাই, এটা হতে পারে না।‘

‘ ওখানে মা যে তোমার জন্য সকাল থেকে কতো রান্না করে রেখেছে। তুমি জানো না মা বাবা তোমাকে কতো ভালোবাসে।? আমি মাকে কথা দিয়েছি, আজ মায়ের মনি মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসবো।   আর, এবার ও সবার সামনে  তুমি আমাকে হারিয়ে দেবে ?’ 

মৃণালের শেষ কটা শব্দ মনির  একেলা বুকটাকে চিড়ে ফালাফালা  করে দিলো। এতো বছরের বুকে জমে থাকা কষ্ট বাঁধ মানলো না। কৌশিককে হারানোর শোক, মৃণালের মা বাবার স্নেহ, নিজেকে জোর করে একা এক কোণে ফেলে রাখার যন্ত্রণা, সব কিছু যেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ওকে ছাপিয়ে বাইরে আসতে লাগলো। দুই হাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো মনি। 

এই কান্নার দরকার ছিলো, মৃণাল বোঝে। মনির মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দেয়। 

‘ওঠো। একটা টিপ পড়ো।‘  জামার পকেট  থেকে টিপের পাতা বের করে এগিয়ে দেয় মৃণাল, ‘ টিপ পড়লে আমার বউকে অনেক সুন্দর দেখায়’  

মনিদীপা অবাক হয়ে চেয়ে দেখে মৃণালকে। কোনোদিন এতো ভালো করে মানুষটার দিকে তাকিয়ে দেখেই নি। আজ মৃণাল ওর মনের কালো মেঘ কাটিয়ে, শরতের হালকা সাদা মেঘ ছড়িয়ে দিয়েছে। মৃণালের চোখে মনি নিজেকে দেখতে পায়। ওর নিজের আনন্দ, মনের উচ্ছ্বাস যেন মৃণালের চোখে ঝিলিক দিচ্ছে। বুকের মধ্যে ভালবাসার বাঁশির সুর ও যেন মৃণালের কথায় ভাসছে। 

মনি বুঝতে পারে, মৃণালের মনের আয়নায় ও কখনই ফ্যাকাসে হয়ে হারিয়ে যায় নি, সব সময় ফাল্গুনী পূর্ণিমার চাঁদের মতোই উজ্জ্বল  হয়ে আছে। এটাও বোঝে মৃণালই তার মনের আয়না। সব আবেগ নিয়ে ধরা দেয় মৃণালের বাহুডোরে।   

  

********