বনলতা-নীরা -সময়ের সজীব সমস্তে 
















বার্থেস বলতেন ‘লেখক মারা গেছেন’-ভাষা থেকে যে নির্মাণ তিনি করলেন সেই নির্মাণের শেষেই লেখকের মৃত্যু ঘোষণা করলেন আর পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলেন সমস্ত শব্দ, মূর্ত ও বিমূর্ত সমস্ত প্রতীক। পাঠক এবার সেই চিহ্নদ্বারা পরিচালিত হবেন কিন্তু সীমাবদ্ধ হবেন না বাঁধা পড়বেন না বরং লেখকের ছেড়ে যাওয়া বীজ থেকে পাঠকের বহুবিবিধতা নির্মিত হবে এমনই ছিল বার্থেসের উপলব্ধি। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় লেখকের চিহ্ন কিভাবে যেন নিষিক্ত হয়ে গেছে পাঠকের অস্তিত্বের সাথে, আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে চরিত্ররা আর প্রতীকেরা হয়ে উঠেছে প্রবণতা। বনলতা কিংবা নীরা কোথাও যেন এমনই কিছু রেকারেন্ট ভাষ্য। যেকোনো লেখনীর চিহ্ন বা সাইনগুলো যখন পাঠকের হাতে পড়ে বিকেন্দ্রীকরণের পরিমাপ খুঁজছে ক্রমশ দূরবর্তী হতে চাইছে তখন কোথাও যেন বনলতা বা নীরা পাঠককে চরিত্রের কেন্দ্রীয় অভিমুখে ক্রিয়াশীল করে তুলছে আর কবি এবং পাঠকের মধ্যেকার যে চিরাচরিত ডায়েলেকটিকাল রিলেশন তাকে রূপান্তরিত করছে একধরনের সমতলীন টেক্সটে যেখানে কবি ও পাঠকের অবস্থান সতন্ত্র ও স্থায়ী হয়েও লিপ্ত হয়ে আছে একে অপরের সাথে। কিন্তু কিভাবে! আসলে শিল্পের যে কোনো চরিত্রের মধ্যেই একধরনের ভার্চুয়াল প্লেজার থাকে একধরনের আপাত সহবাস, কবি যাকে সৃষ্টি করলেন সে কেবল অলীক ইমেজ নয় বরং রিয়েলিটি প্রিন্সিপালের সাথে নির্জ্ঞান ভার্চুয়াল জগতের সংঘাতেই গড়ে ওঠে ওই প্রতীকি যোগাযোগ। এখন কবি তো তার স্বপ্নগুলোকে মননের কিছু কোয়ালিটেটিভ মুভমেন্ট দিয়ে গেঁথে দিলেন চরিত্রের গায়ে সেখানে বিভিন্ন রঙের বিভাজন বিবিধ আলোছায়া। পাঠক কিন্তু বাস্তবে দাঁড়িয়ে একধরনের অশান্ত উত্তপ্ত ক্যাওসে দাঁড়িয়ে কবির ছেড়ে যাওয়া ওই চরিত্রের মুখোমুখি হচ্ছেন, অথচ তার ইচ্ছে বাস্তবে পালটে গেছে আর স্বপ্ন খোলাখুলিভাবে সক্রিয় কবির ছেড়ে যাওয়া চরিত্রের দৃশ্যচিত্রে। এখানেই গড়ে উঠছে পুনরুদ্ধারের খেলা। বির্ণিমান। বাস্তব ও বাস্তবাতীতের দ্বিমাত্রিক বৈপরীত্যে পাঠক ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে চরিত্রগুলির সাথে। এখন ইমেজের অভ্যন্তরস্থ উপকরণই একমার কারণ যা পাঠককে পরিধির দিকে না যেতে দিয়ে কেন্দ্রে আকর্ষণ করবে, বনলতা বা নীরা চরিত্রগুলোকে জীবনানন্দ বা সুনীল কিন্তু কখনই পাঠকের মনের কথাটিকে স্মরণ করে গড়েননি কিন্তু চরিত্রগুলির নান্দনিক নির্মাণের সাথে সাথে দানা বেঁধেছে জীবনের কিছু মৌলসুর, স্বপ্নাদ্য হয়েও যা সীমাবদ্ধ করে দেয়নি মানসিক অনুভূতিগুলোকে আর তাই  পাঠককে তারা কেবল ইমেজের উলম্ব ব্যঞ্জনা ছাড়াও নাড়া দিতে চেয়েছে পরস্পর প্রবিষ্ট কিছু চেতনীয় অন্তর্গ্রন্থির মধ্যে দিয়ে, আনন্দ দিতে চেয়েছে দুঃখ দিতে চেয়েছে, নীরা বা বনলতার সূক্ষ্মতর দার্শনিক রূপের বাইরেও পাঠক তাই প্রতীকের মিথ কিংবা নিছক কাহিনীবলয় ছিঁড়ে জড়িয়ে গেছে কিছু স্বাভাবিক ইচ্ছেপূরনের সঙ্গে। নীরা বা বনলতার ভিয়েনে জীবনানন্দ বা সুনীল আসলে যা সৃষ্টি করছেন তা এককথায় নিরবধিকাল ছুঁয়ে থাকার ছন্দ। সেখানে একজন সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ঠাট্টা তামাশা সুখ দুঃখ অভিমানের মত প্রায় প্রতিটি সংজ্ঞান বিদ্যমান। ওই বিমূর্ত শব্দছবির মধ্যে তাই দীর্ঘস্থায়িত্ব পেয়েছে বাস্তবের শেকড়বাকড়। অর্থাৎ নীরা বা বনলতা যাদেরকে শব্দের অক্ষরের সন্নিধিতে দেখলে মনে হচ্ছে সীমাহীন বিভ্রম অথচ তাই যেন প্রতিমুর্হুতের নিশ্চিত এক বাস্তব।  তারা যেন নড়ে চড়ে কথা বলে হাসে গান গায় পাঠকের সাথে, আর এই প্রাকৃত পরিশ্রুত মৌলিক চরিত্রগুলোর মাঝে এমন একটি সামষ্টিক দোহাট দরজার মূল ভিত্তিই হল প্রেম। সেই রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন-“মিলনের মধ্যে যে সত্য, তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম। তাহা আংশিক নহে, তাহা সমগ্র; কারণ, তাহা কেবল বুদ্ধিকে নহে, তাহা হৃদয়কেও পূর্ণ করে…….মিলনের যে শক্তি, প্রেমের যে প্রবল সত্যতা, তাহার পরিচয় আমরা পৃথিবীতে পদে পদে পাইয়াছি। পৃথিবীতে ভয়কে যদি কেহ সম্পূর্ণ অতিক্রম করিতে পারে, বিপদকে তুচ্ছ করিতে পারে, ক্ষতিকে অগ্রাহ্য করিতে পারে, মৃত্যুকে উপেক্ষা করিতে পারে, তবে তাহা প্রেম...” ...নীরা বা বনলতা জীবনের ওই স্বাভাবিক প্রর্দশনীগৃহটিতেই আলো ফেলেছে বারবার, তারা তো বাস্তব নয় কিংবা বাস্তব থেকেই চেলে নেওয়া কিছুটা ব্যবচ্ছেদিত অভিজ্ঞতা যা কবির কাছে পেয়েছিল চিন্তনের স্বাধীনতা তাই পাঠকের কাছে হয়ে উঠল একধরনের মিথষ্ক্রিয়া;  কবি যে বিস্ময়ের সাথে কল্পনার সাথে নীরা বা বনলতার ‘অন্তঃকৃতির লিপিরূপা’ দিয়েছেন পাঠক জানে তারা কেউ বাস্তবে নেই অথচ ব্যক্তির নিভৃতে জারিত সেই এক্সপ্যান্ডেড এক্সপ্রেশনিজমে তারা রিয়েল ও সুপার রিয়েলের এক পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টি করে, ধীরে ধীরে তারা ভাবে ওই তো আছি, দিব্যি বেঁচে আছি ডালপালা মেলে আছি নীরা বা বনলতা নাম্নী কোনো নশ্বর প্রণয়ীর অজ্ঞাত অদৃশ্যে। যা সে চেয়েছিল অথচ যা হবার নয় পাবার নয় আবার যার কাছে এই না পাওয়াও বাহ্য হয়ে ওঠে বারবার তাই যেন নীরা তাই যেন বনলতা, চরিত্রগুলির মধ্যে জীবনানন্দ বা সুনীল যে গল্প প্রদান করেছেন সেখানেই পাঠকের প্রতিগল্পের খোঁজ আর তাই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে দশকের পর দশক...  





শুরুতেই বার্থেসের মতানুযায়ী প্রসঙ্গায়িত করা হয়েছিল যে প্রশ্ন অর্থাৎ কবিতা কবির জ্ঞাতবাসভূমি থেকে পাঠকের কালচেতনা ও ভাবনায় চিরবিখন্ডিত- সে প্রশ্নের উত্তর যেমন অনির্নীত ঠিক তেমনি আরও একটি চিরপ্রবাহী প্রশ্নও তরলভাবে গড়িয়ে যায় কবির অন্তজৈবনিক ও অনুভবের অসংখ্য অব্যক্ত আকুতিতে – আর তা হল একজন কবির জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা ও কল্পনামিশ্রিত সার্বিক যাত্রাপত্রের সঠিক ঠিকানাটা আসলে কি? বাকের স্রোতের স্পন্দিত চলমানতার ভেতর দিয়ে ঠিক কোন পথ তিনি ছুঁতে চান ! এর উত্তরও হয়ত আমাদের ধরাছোঁওয়ার বাইরেই থেকে যাবে কিন্তু এ কথা অবশ্যই স্বীকার্য কবির এই চিরনিঃশেষ যাত্রায় কেবলমাত্র নিয়তিহীন অনির্দেশ্যের সময়হারা হাতছানিই নেই বরং যে প্রাণের অতিরিক্তের দিকে তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা সেখান থেকেই কখন না জানি পাঠক চেয়ে বসে তার প্রতিমুর্হুতের আশ্রয়।  অর্থাৎ যে অলৌকিক কল্পনার উৎসপথে কবির সৃষ্টিচর্চা চলে তার মধ্যেই হয়ত জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই লুকিয়ে থাকে কোনো লৌকিক সরণি। বহিরঙ্গের আয়োজন থেকে কবি অন্তরঙ্গের একটা যাওয়াকে যখন একধরনের নির্মোহ উৎক্রমণের রূপ দিতে থাকেন তখন তার মাঝেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে পাঠকের বহুবর্ণ সংক্রমণ ! আর এই সংক্রমণে কবিতার বিশেষ বিশেষ নিভৃত মাধুরীরা দায়িত্ব পালন করে গেছে বারেবারে। ঠিক যেমন জীবনানন্দের বনলতা বা সুনীলের নীরা-এসব চরিত্রতে তো কেবল একটিমাত্র দৃশ্যসুখ নেই বরং অগনিত মানুষ আর অসংখ্য জীবন ভীড় করে আছে, যারা কবির অন্তিম সৃষ্টি বা চেতনাবিসারকে মহাইতিহাসের ব্যঞ্জনায় মন্ডিত করছে। নীরা বা বনলতা কি তবে আইকোনোক্লাসটিক কোনো টেক্সট? হয়ত না, কারণ নীরা বা বনলতার মধ্যে পরীক্ষার চেয়েও অনুভূতি আবেগ ও মনস্তত্ত্বের ইমেজারি প্রতীত হয়ে ওঠে। কিছুটা হলেও পাঠক ও কবির মাঝে তারা সেই অনুঘটক যারা কবির কল্পনার বাইরেও কুশীলব হয়ে মানুষের মানচিত্র আঁকতে চেয়েছে বারবার। হয়ত এ জাতীয় অমর চরিত্রগুলির জন্যই কবির একটি সাধারণ ছবি অনায়াসে সর্বজনিক প্রকাশমাধ্যম হয়ে উঠেছে। আসলে কোথাও না কোথাও কবির যাত্রা মানবযাত্রা আর তাই বিশেষ বিশেষ চরিত্রকে কেন্দ্র করে কবিতার মধ্যে দিয়ে যে চিরকালীন আত্মস্বতন্ত্রতা খুঁজে ফেরেন কবি তার মধ্যেই পাঠক খুঁজে পান তার ক্ষণকালীন আত্মসর্বস্বতাকে। কবির চরিত্ররা তখন শব্দের প্রেত ছেড়ে বেরিয়ে এসে পাঠকের স্বপ্ন-সৌরভে মেতে ওঠে। ব্যক্তির থেকে হয়ে ওঠে জায়মান ব্যক্তিত্বের। বনলতা বা নীরা-আলোচ্য প্রবন্ধে যে দুটি কাব্যিক চরিত্রকে আমরা শব্দের অলিন্দ থেকে বের করে আনতে চাইছি, গলা জড়িয়ে তর্ক করতে চাইছি তারা কিন্তু আজ আর কোনো ব্যক্তিক প্রস্বর মাত্র নয় বরং তাদের মধ্যে প্রাত্যহিক ও পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে বৈশ্বিক সংবেদনা। যেন স্রষ্ঠার হাত ছেড়ে কোন অজান্তিতেই চরিত্রগুলো তাদের হাত পা চোখ মুখ সমস্ত শরীরসহ ঘ্রাণ পেয়ে গেছে মানুষের। মাঝে মাঝে মনে হয় আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বছর আগের চরিত্ররা কিভাবে আদি থেকে অভিনব হয়ে উঠল জন্ম জন্মান্তরের হয়ে উঠল? আসলে কোথাও যেন “সময়ই গঠন করে স্রষ্টাকে”। সময়ই স্রষ্টার কাছে সেই প্রেরণা যা সমকালকে একটি ব্যক্তিকাল এবং একটি ব্যক্তিকালকে আরও একটু বৃহত্তর স্পেসিং দিয়ে মানবকালে পরিণত করে। এই মানবকালের প্রতিনিধিই আমাদের বনলতা কিংবা নীরা। জীবনানন্দ যেমন বলতেন- “মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়। অতীতের থেকে উঠে এসে আজকের মানুষের কাছে/ প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে”-বনলতা বা নীরা যেন তেমনি একটি ব্যক্তিকাল পেরিয়ে একটি সার্বিক মানবকালের মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত, প্রতিনিয়ত তন্ন তন্ন খুঁজছে একটি মানুষকে, যার আনন্দ আছে অভিযোগ আছে হেতুহীন তর্ক আছে ব্যাখাহীন বিশ্লেষণ আছে, যে তার নিজেরই চারপাশের “অভ্রান্ত একা আয়ুহীন কক্ষলোকে” ঘুরতে ঘুরতে শূন্যতায় পর্যবসিত হওয়ার আগে নিজেরই ক্ষণকালের দ্বিধা দ্বন্ধের পরিমাপ করতে চাইছে। আসলে বনলতা বা নীরার মত স্মরণযোগ্য কাব্যিক চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে জীবনানন্দ বা সুনীল কোথাও যেন চিরন্তনের মুখোমুখি করে দিয়েছেন আমাদের। যেখানে লেগে রয়েছে অস্তির অলক্ষের বাসনা, যা নিয়ত যা নির্দেশহীন; আকাঙ্খিত ইপ্সিত এক অপ্রাপ্যের অভিসার যেন বনলতা বা নীরাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কয়েক দশক ধরে। চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে একজন কবি যে ব্যক্তিগত বোধের সাপেক্ষে অতিজীবিত থেকে অতিপ্রাকৃতে মহানিষ্ক্রমণ করতে চেয়েছিলেন তাই হয়ত একজন পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছে তার নিজের পায়ের শব্দ তাই হয়ত তার দৈনন্দিন প্রচ্ছন্ন বাসনাগুলির সাঁকো হয়ে উঠেছে যার বাঁকে বাঁকে ধরা একজন কবির কালের যোগসূত্রগুলো। অভিজ্ঞতার অনুভবের আরোহী অবরোহীগুলো। এবং সাথে সাথে সামান্য এক পাঠকের স্বীয়কালগুলি স্বকালচেতনাগুলি।




কাল ! হ্যাঁ, এই কালকে কেন্দ্র করেই হয়ত আমরা বনলতা ও নীরার মনোবৃত্তির কাটাকুটি খেলায় মেতে উঠতে পারি। প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে বনলতা বা নীরার মত চরিত্রদের যুগোত্তীর্ণ করার পেছনে কি কবির মহাকালীন হয়ে ওঠার সচেতন কোনো প্রচেষ্টা থাকে ! এ প্রশ্ন আরও গাঢ় হয় যখন নাম কবিতা ‘বনলতা সেন’-র শুরুতেই জীবনানন্দ বলে ওঠেন- “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে.........অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে/ সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে” ...’ঝরা পালক’ থেকে ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ হয়ে ‘বনলতা সেন’ প্রায় সব কাব্যগ্রন্থেই এমন ইতিহাস চেতনার সাক্ষ্য জীবনানন্দীয় কবিতারা। তিনি নিজেও বলতেন- “মানব বৃত্তান্তের কোনো এক বিশেষ অধ্যায়ে কোনো কবিতার জন্ম হলেও তারা অন্য কোনো সমাজের জন্ম হতে পারত, বৃত্তান্তের অপর কোনো স্তরে- হয়তো ভবিষ্যতকালের-এমন কি ঢের দূরের ভবিষ্যতের”- অর্থাৎ এক ধরনের প্রবহমানতাই জীবনানন্দের মনস্তত্ত্বের মর্মমূলে প্রাধান্য পেয়েছে। আর তাই তার ব্যক্তিগত সত্য যখন কবিতার নতুন সত্য হয় উঠেছে তখন তার মধ্যে মহাকালের অন্তর্লীন তাড়নাও রয়ে গেছে। ফলে শ্যামলী সুদর্শনা বা বনলতার মত চরিত্রগুলির মধ্যে ব্যক্তি থেকে উত্তরব্যক্তি সত্তার যে হয়ে ওঠা তার ভেতর বারবার প্রশ্ন উঠতেই পারে তা কতটা মানুষের কাছের, জীবনের কাছের, ব্যক্তির কাছের ! আর এ প্রসঙ্গে আলোচক দীপ্তি ত্রিপাঠীর সন্ধানী বিশ্লেষণটি বিশেষ ভাবে উল্লেক্ষ্য। তাঁর “জীবনানন্দের কাব্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য” প্রবন্ধে দীপ্তি ত্রিপাঠী বলছেন- “ইতিহাস চেতনার ব্যাখা প্রসঙ্গে এলিয়ট একদা বলেছিলেন- a perception not only of the pastness of the past , but of its presence- এবং এ ইতিহাসচৈতন্য কাব্যকে ঐতিহ্যের সংগে যুক্ত করে সমৃদ্ধ ও প্রাণবান করে- “this historical sense which is a sense of the timeless as well as the temporal and of the timeless and of the temporal together, is what makes a writer traditional- এই টাইমলেস (timeless) ও টেম্পোরাল (temporal)-র সমন্বয় ‘বনলতা’। ...তাঁর কাছে বাইরের জগত কেবল বর্তমান যুগের মূল্যবোধেই সীমাবদ্ধ নয়। তার  মধ্যে রয়েছে সমগ্র বিশ্ব, সমগ্র যুগ-যুগান্ত, রয়েছে আবিষ্কৃত অনাবিষ্কৃত সভ্যতা, উর, ব্যবিলন, নিনেভে, মিশর, বিদিশা, উজ্জয়িনী।অতএব তিনি প্রাণদায়িনী উৎসের সন্ধানে যাত্রা করলেন, খুঁজলেন তাকে বিভিন্ন ঐতিহ্যের মধ্যে”- অর্থাৎ এক কথায় জীবনানন্দীয় কাব্যে মহাকালীন চেতনার একধরনের সচেতনতা ছিল একথা অনস্বীকার্য, কিন্তু চরিত্রকে তিনি জেনেবুঝে অতিকথার মডেল করতে চাননি। বনলতা যখন নাটোরের মেয়ে হয়ে কবির স্বাগত আত্মীয় হয়ে ওঠে, দুদন্ড শান্তি দেয় ক্লান্ত-প্রাণ কবিকে কিংবা ‘সব পাখি ঘরে ফিরে আসে –সব নদী ফুরায়’ এর মত অ্যামিকিয়েবল একটি ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে কবি যখন বনলতাকে চিত্রায়িত করেন নিকট থেকে নিকটতর সান্নিধ্যে তখন বনলতার মধ্যে দিয়ে আদতে ফুটে ওঠে একটি বর্তমান, যেখানে ব্যথা বিক্ষোভ অনাশ্রয় প্রেমহীনতার মত দৈনন্দিন শূন্যতাগুলি জীবনের প্রাত্যহিক লেনদেনগুলি স্বপ্নের সাথে সমান্তরালে জেগে আছে আর সত্তা তার আপন প্রতিচ্ছবি খুঁজে চলেছে কোনো এক প্রান্তিক আবাসভূমিতে। আসলে এই ইতিহাস এই মহাকালের অভিযানে কোথাও হয়ত বনলতা আমাদের সমকালের অপূর্ণতার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার কথাই বলে এবং বারবার প্রেরণা দেয় ছুঁতে চায় হৃদয় জুড়ে জেগে থাকা সেই পূর্ণজীবনের আকাঙ্খাটিকে। অর্থাৎ ভারতসমুদ্রের তীরে কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারায় কিংবা টায়ার সিন্ধুর পারে কিংবা পারস্য গালিচা, কাশ্মিরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবালে ভরা প্রাসাদে থাকা কবির চিরদিনের নারীর দেহ থেকে শতাব্দীর নীল রংটুকু মুছে দিলেই আমরা পেয়ে যাব একেবারে জীবন্ত বনলতাকে যে কিনা চোরাকাঁটা বেঁধা হলুদরঙের শাড়ি পরে এলোমেলো অঘ্রাণের খড়ে দাঁড়িয়ে আছে আজকের হয়ে। অর্থাৎ ভাবচেতনার সাথে লোকচেতনার মিশেল বনলতা। তার সাথে লেপটে আছে যে ভিস্যুয়াল কম্পোজিশন তা একদিকে যেমন মহাকালীন মার্গসংগীতে ভরপুর তেমনি তা কোথাও যেন জীবনের প্রতি অমোঘ আকর্ষণেরও প্রতিনিধিত্ব করছে আর জীবন মানেই তার সাথে শরিকি ক্লান্তি বেদনা আকাঙ্খার মত মননের অন্তস্থলেরর সেই অনন্ত পরম্পরা। পাশাপাশি সুনীলের নীরাও কিন্তু মানুষের আবহমান অভিজ্ঞতাকে কেবলমাত্র স্বকালের সংশ্লেষ না দিয়ে অতীত ঐতিহ্যে টেনে এনে মাপতে চেয়েছে মহাকালীন মুক্তাঞ্চলটি ; মানুষীর আকৃতির মধ্যে লেগে রয়েছে দু'এক টুকরো ফাঁক আর মাঝের ফাঁকগুলোতে মহাসময়ের মহাপয়ার। নাহলে যে নীরাকে প্রত্যক্ষ করে সুনীলের প্রথম পংক্তি –“বাসস্টপে দেখা হল তিন মিনিট, অথচ কাল তোমায় স্বপ্নে বহুক্ষণ”- সেই নীরাকে উদ্দেশ্য করেই কবি কেন লিখলেন- “দেখেছি ছুরির মত বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে-দিকচিহ্নহীন-/বাহান্ন তীর্থের মত এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে/তোমাকে দেখেছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের/ নীল দুঃসময়ে”- কোথাও কি বাস্তবতার জীর্ণতাগুলোই হাজারো স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে আনন্দের উত্তরাধিকার খুঁজছে না? নীরাকে ঘিরে এই যে প্রকাশময়তার জন্ম যাকে আমরা স্থানিক থেকে কালিকে ক্রমউত্তরিত হতে দেখি তা কোথাও যেন আবহমান কাল পেরিয়ে যাওয়ার এক নিঁখুত প্রস্তুতি। এ তো প্রতি যুগের গল্প আর এ গল্পেই মানুষ তার বাস্তবতায় রক্তাক্ত হয়ে প্রাত্যহিক কথোপকথনে বারবার খুঁজে ফিরেছে এক বা একাধিক অনতিসার্থক স্বপ্ন। প্রনয়ীর ছবির মধ্যে দিয়ে বিধুনিত হয়ে উঠেছে একধরনের না পাওয়া নশ্বরতা এক ধরনের অধরা প্রশান্তি। যা নেই তাই তো সত্য, চোখে যা ধরা পড়েনি তাকেই তো মানুষ খুঁজে চলেছে প্রতিমূর্হুতের পরিসরে। স্বপ্ন ও জাগরণের দৌত্যে খুঁজে চলেছে অস্তির অধরা অভিধাটুকু। বাস্তব আর পরাবাস্তবের দ্বন্ধে চিত্রিত জীবনানন্দ বা সুনীলের বনলতা কিংবা নীরা তাই বারবার পাঠকের ছায়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, পরিনতির আকুতিতে । চেতন ও অবচেতনের প্রান্তর জুড়ে পাঠকের যে স্বরাজ  যেখানে রয়ে গেছে একটি যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষ একটি না পাওয়া মানুষ তার ভালোবাসা প্রেম যন্ত্রণার মত একাধিক ইন্দ্রিয়বেদ্যতা নিয়ে সেখানেই একধরনের মাত্রিক মনতাজ হয়ে উঠেছে চরিত্রগুলি। “হঠাৎ নীরার জন্য” কবিতায় সুনীল যখন লিখলেন- “দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি/ আজই কি ফিরেছো? / স্বপ্নের সমুদ্রে সে কি ভয়ংকর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন/ তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মত দূরে /তোমার দিগন্ত, দুই ঊরু ডুবে গেছে নীলজলে /তোমাকে হঠাৎ মনে হলো কোনো জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো/ অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা”- তখন কি মনে হয় না অলীক সৌন্দর্যমন্ডল থেকে কোনো এক বর্তমান দ্বন্ধ-সংকটে নীরা নেমে এল একখন্ড মাংসটুকরো হয়ে ! কি আশ্চর্যভাবে এখানে একটি খন্ডসময়ের সাথে একটি অখন্ডসময়ের আপেক্ষিক অভিঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে স্বপ্নের সমুদ্রে দুই ঊরু ডুবে যাওয়া আবার অন্যদিকে তিনদিন পরে চরিত্রের আত্মঘাতী হওয়া –এ যেন আর্দ্র চেতনার সাথে প্রাণের কথার নিরন্তর এক টানাপোড়েন, কল্পনার ভেতর মিশে যাচ্ছে কথা আর কথা থেকে উঠে আসছে কল্পনা- ভ্রাম্যমান অভিব্যক্তি খুঁজে ফেরা যেন। নীরা বা বনলতার একাধিক কবিতায় সুনীল বা জীবনানন্দকে আমরা এই ধরনের সিনথেসিস নিয়ে বারবার পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেখি। একদিকে বনলতা সেনের ‘আমাকে তুমি’ কবিতায় জীবনানন্দ বলেন- “জানলায় জানলায় অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে;/ পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়/ তারপর/ দূরে/ অনেক দূরে/ খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মতো ধান ভানে-গান গায়-গান গায়/ এই দুপুরের বাতাসে” – সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে অলক্ষ্যের চরিত্রটিকে দুটি আলাদা আলাদা চেতনা দিয়ে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে- একটি স্থানচেতনা অপরটি পারিপার্শ্বিক পেরিয়ে যাওয়া এক অসীম চিত্রধর্মিতা। বনলতা এই পৃথিবীর চেনাজানা জানলায় জানলায় দাঁড়িয়ে কথা বলে, গান গায় এই পৃথিবীর দুপুরের বাতাসে আবার এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দৃশ্যপটগুলিকেই মায়াবী নদীর পাড়ের দেশ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতেই চরিত্রটির স্থানিক গতিময়তা কমে গিয়ে তা কালপ্রবাহের চিত্রকল্প হয়ে উঠল। একেবারে নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যতবারই বনলতাকে ছুঁতে চাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে ততবারই মনে হয়েছে কবি যেন টিল্ট করাচ্ছেন প্যান করাচ্ছেন তাঁর মননের ক্যামেরাটিকে, সময়ের ট্রলি লাগানো প্ল্যাটফর্মে চেতনাকে বসিয়ে ডলি শট নিয়ে চলেছেন বনলতার। আর দৃশ্যমূল্য বদলে চলেছে বারবার। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও ইতিহাসবোধ দিয়ে কি জীবনানন্দ সময় ও সমাজকে বারবার পেরোতে চেয়েছিলেন নাকি একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘের চরিত্রকে খন্ডকালের স্বরূপ থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন ! এমনতর নিরবিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে পড়াই যে ১৯৪২ এর বনলতাকে আজও আধুনিক করে তোলার অন্যতম উপাদান সে বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। আধুনিক কবিতা প্রসঙ্গে তাঁর “কবিতার আত্মা ও শরীর”-এ জীবনানন্দ নিজেও তো বলেছেন- “আধুনিক কালের প্রাণের কথা এক দিক দিয়ে যেমন সংহতি সন্ধান করছে অন্যদিক দিয়ে তেমনি তথাকথিত আপেক্ষিক কালের প্রতীকের মতো সমাজ ও জীবনের আধুনিক বন্দিদশার সীমা লংঘন করে অমেয়তার অন্তঃকরনে ছড়িয়ে পড়তে চাচ্ছে। “বনলতার মধ্যে আমরা পাই এই ছড়িয়ে পড়ার সুরমূর্ছনাই। পাঠকের কাছে ‘সমসাময়িক কালকে অতীত ও আনন্ত্যের সঙ্গে অন্বিত করে ঈষৎ নিরাসক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখার ক্ষমতা’ জীবনানন্দ দিয়ে গেছেন বনলতার সাথে । কিন্তু এ প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে সূক্ষ্ম ভাবমন্ডল বনলতার সত্তার আধারে সিঞ্চিত করে গেছেন জীবনানন্দ সেখানে ভবমন্ডলের স্থূলতা ঠিক কতখানি !




নীরা অনেক মাটির কাছাকাছি, বনলতা সে অর্থে সূক্ষ্ম অতিসূক্ষ্ম অধিবাস্তবতা বেষ্টিত-নীরা-বনলতার পারস্পরিক তুল্যমুল্যতায় এমনটা বলা হয়ত খুবই সরলীকরণ হয়ে যাবে। তবু মাংসের যতটা কাছের নীরা যতটা মননের ঢোলা আলখাল্লা পরিহিতা বনলতা ততটাই আভরণে ঢাকা, যেন তার গোটা হাতটিকে কখনই ছোঁওয়া যাবে না তা ছায়াপথের ভাষা। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নীরা পাঠকের রক্তিম সংকলন হয়ে ওঠে সেখানে কি বনলতা খোলা চোখে  কেবল এক শাশ্বত মহাশূন্যের রূপানুকৃতি ? প্রাথমিকভাবে বিষয় বা উপমা নয় বরং পংক্তির মধ্যে মিশে থাকা বাস্তবের সিনট্যাক্সগুলি হয়ত কিছুটা হলেও দায়ী এ ব্যাপারে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর “নীরা, তোমার কাছে” কবিতায় লিখলেন- 


“ তোমার রং একটু ময়লা, পদ্মপাতার থেকে যেন একটু চুরি


  দাঁড়িয়ে রইলে


  নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো।





  নীরা, তোমায় দেখি আমি সারাবছর মাত্র দুদিন


  দোল আর সরস্বতী পুজোয়- দুটোই খুব রঙের মধ্যে


  রঙের মধ্যে ফুলের মধ্যে সারা বছর মাত্র দু দিন –


  ও দুটো দিন তুমি আলাদা, ও দুটো দিন তুমি যেমন অন্য নীরা


  বাকি তিনশো তেষট্টিবার তোমায় ঘিরে থাকে অন্য প্রহরীরা ...”





এই নীরাকে আমরা রোজ দেখি, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাসে, ট্রেনের জানলায় বসে হাত নাড়ায়, আবার হারিয়েও যায়, এ নীরা কোনো সাধনমার্গের যাত্রী নয় বরং একেবারে দৈনন্দিন মানুষের ক্ষুধায় জ্বালায় আলোয় অসহায়তায় অনুদিত; অন্যদিকে জীবনানন্দের বনলতা যেন বাস্তবের থেকে কিছুটা বেশি, অথবা বলা ভালো স্বাপ্নিক বাস্তবতার বর্ণনাভাস পাওয়া যায় বনলতার পরতে পরতে। জীবনানন্দের কবিতায় পরাবাস্তববাদের অন্বেষণ নতুন নয়, বিষয় থেকে বিষয়ারিক্তে সত্য থেকে আরো সত্যে বারবার অবচেতনের পৃথক জগতে ডুব দিয়েছেন তিনি। আঁদ্রে ব্রেঁত যেমন সুররিয়াল ম্যানিফেস্টোয় কল্পনার এক পৃথক জগতের সপক্ষে বলতেন- “I believe in the future resolution of these two states — outwardly so contradictory — which are dream and reality, into a sort of absolute reality, a surreality...” জীবনানন্দও যেন কোথাও এই অ্যাবসুলিউট রিয়েলিটি ছুঁতে বাস্তবের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক অতিবাস্তবের বেড়া বারবার পেরোতে চেয়েছেন আর তাই বনলতাও হয়ে উঠেছে অস্তির সাথে সাথে আপাত আবছা আলোছায়াময় এক অস্থিরতা । তাই বাস্তবের বিন্যাসেও এক অধিবাস্তব জগত গভীরভাবে যুক্ত বনলতার প্রতিটি রস প্রকাশে। কে এই বনলতা? এও তো নীরার মতই কোনো বাস্তবোচিত সুস্থ ও আনন্দময় প্রেয়সীর চিত্র হতে পারে, কিন্তু কেন তাকে বারবার আমরা মায়াবী সত্তার পরত দিতে থাকি ? এর উত্তর হয়ত ‘বনলতা সেন’ এর প্রতিটি কবিতায় অন্তঃসাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। যেমন “নগ্ন নির্জন হাত” কবিতায়  জীবনানন্দ যখন বলেন- “যে আমাকে চিরকাল ভালোবেসেছে/ অথচ যার মুখ আমি কোনোদিন দেখি নি” তখন একই সাথে বাস্তব ও অতিবাস্তবের ভাবনা প্রতিমা মিলে মিশে যায়। যার কাছে কবি স্পষ্ট কবির কাছে তাই অস্পষ্ট ! এ যেন ফ্রয়েডের সেই transformation of the unreachable primal script into a metamorphosis, which collapses reality and dream. –স্বপ্ন ও বাস্তবের সমীক্ষণ হয়ে ওঠে বনলতা আর সাপ্রেসড রিয়েলিটি থেকে সুপার রিয়েলিটিতে একটি চরিত্রের ক্রমমুক্তি খোঁজেন জীবনানন্দ। যে কল্পনার হাত ধরে কবিতা গড়ে ওঠে তার মধ্যে সংযোজন থাকে একটি বাস্তবের তা যেমন সত্য ঠিক তেমনি সত্য কবি তার অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে দেন কিছু মনের রসায়ন যার প্রকৃত উদাহরণ নীরা, যেখানে নীরা কবির ভাষাআঙ্গিকে বন্দী হয়েছে একেবারে বাস্তবোচিত অভিজ্ঞতার আদলে। -“দরজা বন্ধ ও জানলা খোলা, নাকি জানলা বন্ধ খোলা দরজায় / মানুষ আসে যায়, ‘বিদেশ থেকে কবে ফিরলে সুনীল?’/ আমার উত্তরে তোমার জোড়া ভুরু, ঈষৎ চশমায় লাস্য, অথবা/ সব রকম কাঁচে ছবিও ফোটে না !/ তোমার নামে আনা ছোট্ট উপহার ফিরিয়ে নিয়ে যাই লুকিয়ে/ নীরা, তুমি কেমন করে করলে আমায় এমন লোভহীন/ শুধু ও দুটি চোখ, শুধু ও দুটি চোখ দেখতে এতদূর/ ছুটে এলাম?”- কোথাও যেন নীরা বেশিমাত্রায় বাস্তবে গ্রন্থিত সেখানে বনলতাকে স্মৃতির অভিজ্ঞতার উদ্ভাস থেকে এক নতুন ইমেজারির প্রদেশে দাখিলা দিয়েছেন জীবনানন্দ। সত্যিই কি নীরা বা বনলতা নাম্নী কোন নারী প্রেয়সী প্রেমিকা জীবনানন্দ বা সুনীলের পরিচিত ছিলেন এ জিজ্ঞাসা পাঠককূলের হতেই পারে এমন কি প্রাবন্ধিক গোপালচন্দ্র রায় তাঁর “জীবনানন্দ” বইতেও বলছেন- “একদিন জীবনানন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম বনলতা সেন নামে তাঁর পরিচিতা কোনো মহিলা ছিল বা আছে কিনা। উত্তরে সেদিন তিনি কিছু না বলে শুধু মুচকি মুচকি হেসেছিলেন। নীহারকান্তি ঘোষদস্তিদারও একদিন জীবনানন্দকে ঐ একই প্রশ্ন করেছিলেন। সেদিন জীবনানন্দ উত্তরে নীহারবাবুকে শুধু বলেছিলেন কবিতাটা ভাল লেগেছে কিনা তাই বলুন। অন্য খোঁজে কি দরকার। “- আসলে এই অন্য খোঁজের পেছনে একটা বাস্তবসন্মত কারণ আছে পাঠকের। যে প্রেয়সীকে মানবীকে কবি তুলে আনলেন তার কল্পনার কারক করে, তাঁর নিভৃতলোকের আনন্দ তরঙ্গ কল্লোলকে খুঁজে পেতে যাকে করে তুললেন অনুপ্রেরণা তার মধ্যেই পাঠক যখন নিজেকে এবং নিজের ব্যক্তিগত অস্তিতাকে আবিষ্কার করতে থাকে তখন চরিত্র আর কবির স্বকপোলকল্পিত জগতের একক হয়ে থাকে না বরং চিরন্তন সত্য হয়ে উঠতে চায়। জীবনের তীব্রতম প্রশ্ন মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নীরা, তার সাথে একা হাঁটতে পারি আমরা, মিশে যেতে পারি অনায়াসে তার রক্তের ভাষা তৃষ্ণা আর ব্যর্থতার সাথে। আর এখানেই মাঝে মাঝে রিডারস রেসপনসের জায়গায় দাঁড়িয়ে বনলতা নীরার মধ্যে সেই সূক্ষ্মতম বিভেদটুকু চোখে পড়ে। কোনো যুক্তিবাদী মানুষ নয় বরং একান্ত প্রিয়জনের মত নীরা আমাদের আত্মাকে ছুঁয়ে থাকে যেখানে বনলতার মধ্যে দেখা যায় বাস্তবকে অতিক্রম করার প্রবণতা।অর্থাৎ রিয়েলিজম থেকে সুপার রিয়েলিজম এ পৌঁছতে পাঠককে প্রেমের চেয়ে বড় কিছুর মুখোমুখি করতে চায় সে।  কবির এই কাব্যসৃজনে কোথাও যেন কালেরও এক নির্মিতি চলে। তিরিশের দশকে বিশ্বব্যাপী যে ইমেজিস্ট আন্দোলন যে ইমেজিসমকে স্বীকার করেছিলেন জীবনানন্দ স্বয়ং এবং যে চিত্রকল্পধর্মিতার মধ্যে দিয়েই পরাবাস্তববাদের মধ্যে দিয়ে নিজস্ব ভাবের অভিপ্সিত মিশ্রণটি খুঁজে গেছেন বারবার বনলতা তারই উৎকৃষ্ট ফসল। বনলতা কে নারী না বলে আমরা তাই প্রতীকও বলতে পারি, সেখানে রীতিগত প্রেম বা প্রেয়সীর থেকেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যতিহীন এক প্রাণশক্তি; সে আছে সে নেই- সে এক দূরতর দ্বীপ, বনানীর ফাঁকের দিকচক্রবাল নির্জনতা, সে এক পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ কিংবা কোনো অনন্ত সূর্যোদয় বা অন্তিম প্রভাতের মত ক্লান্তিহীন শাশ্বত। অথচ নীরা নিরীশ্বর নয়, সার্বজনিক মানুষের ‘চেতন অচেতনের ঘুলঘুলিতে তার সার্বিক যাতায়াত’। প্রবল জ্বরে কপালে জলপট্টির মত সে আমাদের সঙ্গী, শুশ্রষাও। এমনকি নীরাকে দেওয়া কবির ছোট ছোট উপহারের মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে বাস্তবের বয়ান। নীরাকে নিয়ে সুনীলের অর্জন বর্জনগুলি কোথাও যেন মধ্যবিত্ত জীবনের গন্ডি ছেড়ে বেরোয়নি। নীরাকে সুনীল দিলেন একটি রঙিন সাবান উপহার আর সেই সাবান তার সারা দেহে ঘুরবে নাভির কাছে মায়া স্নেহে আদর করবে রহস্যময় হাসির শব্দে ক্ষয়ে যাবে শুধু এই প্রত্যাশায়। কিন্তু না এখানেই শেষ নয় বরং ঠিক এর পরের পংক্তিতে সুনীল লিখলেন- “ক্ষয়ে যাবে, বলবে তোমার শরীর যেন অমর না হয়...”- এই এক পংক্তিতেই নীরার সামগ্রিক নির্মাণপর্বের ইঙ্গিত উঠে আসে। নীরার মধ্যে দিয়ে অমরতা চাননি সুনীল, তাকে বাস্তবতার অংশ করে তুলে নির্ভরশীল হতে চেয়েছেন আর তাই নীরার কাছে পাঠকেরও কোনো অমরতা কাঙ্খিত নয় বরং সেখানে প্রেমের দৈনন্দিন আশ্রয়ই চরম আর্তিতে পৌঁছিয়েছে।  সুনীলের নীরা পাঠকের নুন মাখানো হাড়গোড়গুলির পাশাপাশি পায়চারী করতে পারে। কিন্তু বনলতাকে কেবল পরাবাস্তববাদের কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত করাটাও মনে হয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না ; আর এই প্রসঙ্গে আসার আগে উৎপল কুমার বসুর প্রস্তাবিত কিছু জীবনানন্দীয় আলোচনার পুনঃপাঠের লোভ সামলানো গেল না। 





উৎপল কুমার বসু জীবনানন্দের বনলতা প্রসঙ্গে বলছেন-“প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা কবিতার নারী পুরুষের প্রেম সম্পর্ক বিশেষভাবে বর্ণনা-নির্ভর। সৌন্দর্য মুগ্ধতাই হোক বা অনুভবের গভীরতাই হোক একধরনের অঙ্গসংস্থান সাযুজ্যকে বারবার মূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। শরীরের অ্যানাটমিটাই এখানে বড়ো। আবার এই শরীর-সৌষ্ঠবের মধ্যে দিয়েই অধিবাস্তবতা বা metaphysical বিশ্বাসের জগতে ব্যক্তি তার উৎক্রমণকে ঘনিয়ে তুলেছে। বৈষ্ণব পদাবলীতে শেষপর্যন্ত দেহ অতিক্রান্ত ভাবসম্মিলনটাই তো বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণের মথুরা গমনের পরে তাই রাধার এই সুররিয়ালিস্ট জগৎটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবনানন্দ তাঁর বনলতা সেনের মধ্যে দিয়ে নতুন ধারার প্রচলন ঘটালেন। নারীর অবস্থান পালটে গেল। নারী পুরুষ সম্পর্কের ভিত্তি সেখানে ‘Techno-political’। ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’- এ প্রশ্নের মধ্যে এটা স্পষ্ট যে মেয়েটির বিস্ময় তৈরী হয়েছে যুবকের নিরুদ্দেশের কারণে। এই চলে যাওয়াকে সে ব্যাখা করবে বলে বসে আছে। এভাবে বনলতা সেনের অবস্থানগত বিশেষত্ব আমাদের চমৎকৃত করে কারণ দুদন্ডের মুখোমুখি বসার মধ্যে দিয়ে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের একটা নতুন দিক এখানে উঠে আসছে যা শারীরিক নয় বরং মানসিক আদান প্রদানের অন্য এক বৃত্তকে বুঝিয়ে দেয়। অর্থাৎ বাংলা কবিতার ধারায় পূর্বসূত্রে লব্ধ ‘anatomico-metaphysical’ সম্পর্ক সম্ভাবনাকে অন্যভাবে দেখতে চাইছে।“-বৈষ্ণব বা গৌড়ীয় কাব্য প্রেমকে যেমন শেষমেশ দীন জীবনের ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে চাইল বা জৈবতার প্রকাশের দীপ্তি কমিয়ে জীবনের বিচিত্র সুখস্বাদকে যেমন এক সহজিয়ার রূপ দিতে চাইল জীবনানন্দের বনলতার চিত্রকল্পে কিন্তু কেবল এমন নির্জ্ঞান মগ্নচৈতন্যের চর্চা আমরা দেখতে পাই না বরং সেখানে চেতন ও নির্জ্ঞান  চিত্রকল্পগুলি পাশাপাশি গাঁথা। ‘সুদর্শনা’, ‘মহাপৃথিবী’, বা ‘রূপসী বাংলা’য় পারস্পরিক বিপরীত দৃশ্যগুণে জারিত একাধিক এমন মনতাজ পেলেও যেহেতু বনলতা-নীরার মধ্যেই আমরা আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছি তাই ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে সরলীকৃত করা হোক –































কবিতা


  নির্জ্ঞান সংবেদন


     চেতনিক সংবেদন


অঘ্রাণ প্রান্তরে (কাব্যগ্রন্থ –বনলতা সেন)


কিছুক্ষণ
অঘ্রাণের অস্পষ্ট জগতে/ হাঁটলাম/ 
চিল
উড়ে চলে গেছে-/ 
কুয়াশার
প্রান্তরের পথে


হেঁটে
চলি... আজ কোনো কথা/ 
নেই আর
আমাদের;/


মাঠের
কিনারে ঢের ঝরা ঝাউফল/ 
পড়ে
আছে, শান্ত হাত, চোখে তার বিকেলের মতন/ অতল...


দুজন (কাব্যগ্রন্থ-বনলতা সেন)


প্রেমিকের
মনে হল- এই নারী-/অপরূপ/


খুঁজে
পাবে নক্ষত্রের তীরে;/ 
যেখানে
রব না আমি, রবে না মাধুরী/ এই
..


আমাকে
খোঁজো না তুমি বহুদিন- কতদিন আমিও/ তোমাকে/ 
খুঁজি
নাকো- এক নক্ষত্রের নীচে তবু- একই/ আলোপৃথিবীর/ 
পারে আমরা দুজনে আছি;       


শঙ্খমালা
(কাব্যগ্রন্থ- বনলতা সেন)


চোখে
তার/ 
যেন শত
শতাব্দীর নীল অন্ধকার।/ 
স্তন
তার/


করুণ
শঙ্খের মতো ...


সে কে
এক নারী এসে ডাকিল আমারে,/ 
বলিল,
তোমারে চাই ...






  



এখন উপরের তিনটি কাব্যাংশ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে জীবনানন্দীয় নারী চরিত্রগুলো কখনো মানবী তো পরক্ষণেই তারা অতিমানবীয় ঘনাঢ্যে বিন্যস্ত। ‘অঘ্রাণ প্রান্তরে’ কবিতায় যে নারীকে নিয়ে কবি হেঁটে চলার কথা বললেন একেবারে লৌকিক পরিসরে সেই নারীকেই নিয়েই তার নির্জ্ঞান জগত কিন্তু এক অন্য অলৌকিকেও সমানভাবে গতিশীল, মাঠের ওপর পড়ে থাকা স্পষ্ট পথ সেখানে অঘ্রাণের অস্পষ্ট জগত হয়ে ওঠে অচিরেই; আবার ‘শঙ্খমালা’ কবিতায় যে নারীকে দেখে আমাদের মনে হল খানিক আগেই সে যেন ডেকে গেছে কবিকে, সে যেন একেবারে রক্ত মাংসের একটি সত্তা সেই নারীকেই বর্ণনা করতে গিয়ে কবি কল্পনার পরিধি বাড়িয়ে লিখলেন –‘চোখে যেন তার শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার”- আর এখানেই চরিত্র কাঠামোয় কবির আপেক্ষিক মনস্তত্ত্বের দ্বান্ধিক সমীকরণটি সহজেই প্রত্যক্ষিত। যার ফলে বনলতা কেবলই সুররিয়ালিজমে আক্রান্ত বলাটাও কোথাও হয়ত যথার্থ হবে না। বরং বলা ভালো বাস্তব-অতিবাস্তবের চেতন পরম্পরার সংস্করণ বনলতা। ফলে বনলতাকে কেন্দ্র করে জীবনানন্দের প্রেমের শস্যটিকে বুনতে গেলেই প্রেয়সীর বাস্তব মধুঋতায়ণটির মাঝেও পাঠককে কিছু মিতবাক আকস্মিকতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে বনলতার গায়ে কেবল যে অতিপ্রাকৃত আভরণই আছে এমন না বলে আমরা বলতে পারি স্বপ্নের দীর্ঘায়িত দ্বিধার সাথে সাথে কিছু বাস্তবের রক্তমাংসও আছে সেখানে। জীবনানন্দের কবিতায় মহিলা প্রেমিকা কন্যা প্রসঙ্গে দেবারতি মিত্রও যেন এ কথাই বলছেন- “ভাব হিসেবে নৈর্ব্যক্তিক মহিলা হিসেবে তাদের ভূমিকা মহিমময়ীর কাছাকাছি। কিন্তু সেই মেয়েদের গায়ে যেই বাস্তবের আলো এসে পড়েছে, যেই ঈষৎ রক্তমাংস লেগেছে অমনি তাদের মূর্তি যেন ভাঙতে ভাঙতে কুঁকড়োতে কুঁকড়োতে নিরালোকিত হতে শুরু করেছে...”। তবে  ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয় জীবনানন্দের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থে বাস্তবতার কিছু অভিঘাত স্পষ্ট হলেও, ‘বনলতা সেন’এ তা নান্দনিকতায় উর্ত্তীণ হতে বারবার কম্পোমাইজড করেছে বাস্তবের নগ্ন সংবেদনশীলতাকে।




তবে বনলতা বা নীরাকে কেন্দ্র করে জীবনানন্দ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রিয় নারী সম্পর্কিত চেতনার প্রশ্ন-চিহ্নলীন একরৈখিক সংস্করণ স্থাপন যেমন সম্ভব নয় তেমনি এজাতীয় যুগোত্তীর্ণ প্রণয়ের আর্কিটাইপগুলির মধ্যে কিছু সাযুজ্য অবশ্যই বর্তমান, যেমন বিরহরস। এ প্রশ্ন উঠতেই পারে প্রণয়রসাপেক্ষা কারুণ্যরসের আধিক্যিই কি নিঃসঙ্গ মানুষকে জড়ো করল নীরা বা বনলতার দীর্ঘতর ছায়ার নীচে! দুক্ষেত্রেই একাধিক উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে যেখানে নৈকট্যপেক্ষা বিরহ বেদনা বিষন্নতাকেই প্রেমের প্রথম পংক্তি করে তুলেছেন দুজনেই। “নীরার পাশে তিনটি ছায়া” কবিতায় প্রথম পংক্তিতেই সুনীল লিখলেন- “নীরা এবং নীরার পাশে তিনটি ছায়া/ আমি ধনুক তীর জুড়েছি, ছায়া তবুও এত বেহায়া/ পাশ ছাড়ে না”- এ ছায়া কিসের ইংগিত?  নামচরিত্রের চারপাশে এরাই কি সেই বিষাদ, না পাওয়া আর কাঙ্খিত নির্জনতা ! যা চরিত্রের শ্বাসের মতই স্বাভাবিক ! আশ্চর্যভাবে এই বিষাদ কিন্তু মারাত্মক সন্মোহনকারী যা কবির সাথে পাঠককেও বারবার চেনাতে চাইছে প্রেমের প্রকৃত রং। ‘না- থাকা’র এই থাকা কিন্তু নীরার কিছু কিছু কবিতায় পাকা রং মেখে থাকে, যেখানে বিষাদ যন্ত্রণা এবং সম্পূর্ণ একা হয়ে যাওয়ার বিস্ময় না থাকলে নীরার বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনাটি হয়ত সেভাবে প্রকাশশীল হতনা। যেমন নীরাকে নিয়ে সুনীল যখন বললেন-


“দুঃখ পাওয়া গেল, অথচ কোথায় দুঃখ, দুঃখের প্রভুত দুঃখ, আহা


মানুষকে ভূতের মতো দুঃখে ধরে, চৌরাস্তায় কোন দুঃখ নেই, নীরা


বুকের সিন্দুক খুলে আমাকে কিছুটা দুঃখ, বুকের সিন্দুক খুলে, যদি


হাত ছুঁয়ে পাওয়া যেত, হাত ছুঁয়ে, ধূসর খাতায় তবে আরেকটি কবিতা


কিংবা দুঃখ-না-থাকার দুঃখ ...। ভালোবাসা তার চেয়ে বড় নয় !...”





আশ্চর্যের কথা হল জীবনানন্দকে আমরা অবসন্নতার কবি বলে অচিরেই চিহ্নিত করতে  পারি এবং বিষন্নতা বিষাদের শব্দে সমর্পিত এক কবি যার প্রেমের কাব্য অচিরেই অন্তহীন হতাশা আর অপ্রেম জর্জরিত হয়ে উঠবে সে সম্পর্কেও তাঁর চিত্রকল্পগুলি অঙ্গুলির্দেশ করে, কিন্তু সুনীল? আর সুনীলের নীরা? সুনীলের সার্বিক কাব্যগুণে সে অর্থে অতিপ্রত্যক্ষ বিষাদ বা অবসন্নতার মোহ নেই কিন্তু যখন নীরার প্রশ্ন ওঠে তখন দেখি স্মৃতি বা আনন্দের সাথে সাথে দুঃখ বেদনার নস্টালজিয়াও কবি ভাগ করে নিতে চান। আসলে প্রেমের তাৎক্ষণিকতা নিয়ে হয়ত সুনীলও খুশি থাকেননি । তার গোপনা প্রণয়ী নীরার ক্ষেত্রে তাই প্রেমের ক্ষণউল্লাসের সাথে বেদনাও ধ্বনিত হয়েছে বারেবারে। নীরা কেবল পাওয়া নয়, বরং প্রেম সেখানে এতটাই অতলান্ত গভীরের যে না পাওয়াকেও গন্ধ বর্ণ রূপ রসে অনুভবের স্পর্শে প্রতিভাসিত করতে চেয়েছেন স্রষ্টা। নীরার সাথে দেখা হয়না কবির, বছরে মাত্র কয়েকদিন, তবু তো নীরার সাথে তার রোজ দেখা, নীরার সাথে দেখা হয়না পাঠকের তবু তো বাসস্টপে তিন মিনিট অপেক্ষা করে পাঠক হাসির শব্দের মত কোন এক নারীর রক্তস্রোতকে ছুঁতে চেয়ে, মুখের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘোরে নীরার লোভহীন ধূপের গন্ধ কিংবা দুটি চোখ শুধু দুটি চোখ পাপহীন দুঃখহীন দুটি চোখের প্রতীক্ষায় সারাজীবনের শোক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পাঠক। ছোটোখাটো এই প্রতীক্ষা, এই প্রতীক্ষা অবাধ। রক্তমাংসের এক অধরা মানবী হয়েও নীরার জন্য এই প্রতীক্ষা সুনীলও কি করেননি? নীরাকে ঘিরে বিষাদগুলিতে কোথাও যেন মানুষের সামগ্রিক প্রস্বরগুলিই জড়ো হয়ে থাকে; এর মধ্যে দিয়ে জীবনকেই দেখতে চান কবি, দেখতে চান সেই নির্জণ ক্ষণটুকুকে যা বিষাদের একতারা বাজিয়ে কোথাও হয়ত আশাবাদের আলেখ্যগুলিকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চায় বারবার। “যা চেয়েছি যা পাবো না” কবিতায় নীরা সুনীলের কথোপকথন থেকেই উঠে আসে এমনই এক আলোছায়ার খেলা, যেখানে হতাশা পরিণত হচ্ছে আরও বড় কোনো প্রত্যাশায়- “আমার তো দুঃখ নেই- দুঃখের চেয়েও / কোনো সুমহান আবিষ্টতা/আমাকে রয়েছে ঘিরে/ তার কোনো ভাগ হয় না/ আমার কী আছে আর, কী দেবো তোমাকে?/ -তুমি আছো, তুমি আছো, এর চেয়ে বড় সত্য নেই !...” কেবল পংক্তিগুলিই নয় সাথে সাথে তুমি আছো-র শেষে ঝুলে থাকা ওই তুচ্ছ আশ্চর্যবোধক চিহ্ন(!) টিকে নাড়াচাড়া করা যাক। তবে কি নীরার থাকা নিয়ে সুনীল নিজেই সন্দিহান !  এই বিষাদের শেষে কি তবে কেবলই স্তুপাকার আঁধার ! হয়ত না, এই আশ্চর্যবোধক চিহ্ন হয়ত একটি আকস্মিকতার প্রতীক। ক্ষয়ের সাথে সাথে জেগে থাকা আরও এক নতুন ক্ষুধার প্রতীক। অর্থাৎ এই সব প্রশ্ন চিহ্নের ফাঁকে সুনীল দানা বাঁধিয়ে গেছেন আরও কিছু পরিতৃপ্তির দ্যোতকের। তবে বনলতার বিষাদ বা বিচ্ছেদকাতরতায় এমন এক উল্লোল বা আশার বিপ্রতীপ বিন্দুর সরাসরি গ্রন্থনা না পেলেও কোথাও যেন বনলতার সাথে সাথে কেবল এক অসহয়তার মুখাপেক্ষী কবি বা চিরঅলভ্য গাঢ় এক রূপসীর মুখ ভালোবেসে পড়ে থাকা স্মৃতিভারাতুর পাঠক এমনটি ভাবা সার্বিক  সত্য নয়। বনলতাকে ঘিরে গড়ে তোলা তাঁর বিষাদকল্পের মাঝেও কিছু ভাবব্যঞ্জনা আছে, কিছু বিভাজন, চেতনার কিছু দ্বিমাত্রিক সমবায় ও বিন্যাসও আছে।




জীবনানন্দকে নিয়ে আলোচনা বা তাঁর কবিতার পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিত্বে উত্তোরণের বর্ণ গন্ধের হদিশ পেতে বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দীয় গবেষণা এককথায় চিরকালীন অথচ তাঁর কবিতায় প্রেম শব্দের আলোচনা এলেই বেদনার সরলীকরণের স্বাদ গাঢ় হয়ে ওঠে। আলোচক যেন স্থির করেই আসেন কোথাও একটা অভাব রয়েছে তাঁর প্রেমে আর পাঠকেরও যেন তাঁর প্রণয় প্রেয়সীদের কাছ থেকে আরো আরো আরো কিছুটা বেদনার প্রত্যাশা বাড়তে থাকে। শুরু হয় প্রত্যাখানের প্রত্যাশার প্রতীক্ষার আপেক্ষিক প্রতীকগুলোকে প্রণয়ের আর্কাইভ থেকে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে বের করে আনার প্রাথমিক প্রচেষ্টা। আসলে প্রকৃতি নারী আর মৃত্যু-কোথাও যেন এই তিন প্রতীকের রূপবন্ধকেই দুলছে জীবনানন্দের চৈতন্যের সাঁকো। আর যার ফলে সেই “ধূসর পান্ডুলিপি” থেকেই জীবনানন্দীয় প্রণয়ের ডিকশন ও ডিসকোর্সটিকে বারবার ধূসরতর এমন একটি গুণাঙ্ক আরোপ করা হয়েছে। একদিকে যেমন ডঃ সুকুমার সেন তাঁর “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস” গ্রন্থে জীবনানন্দের প্রেমের কবিতা বা জীবনানন্দের প্রেমের স্বাদ তিক্ত বলে অভিহিত করেছেন তেমনি অন্যদিকে দীপ্তি ত্রিপাঠীও তাঁর “আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয়” গ্রন্থের জীবনানন্দ ভাগে লিখছেন- “যে প্রেম তিনি পান নি, যে প্রেম শেষ হয়ে গিয়েছে, যা আর কোনো দিনও ফিরে আসবে না, জীবনানন্দ সেই অচরিতার্থ প্রেমের কবি”। এমনতর একপেশে যুক্তি ও বিশ্লেষণতত্ত্বের জন্য কেবল যে আলোচকদের দায়ী করা যায় তা ঠিক নয় কারণ “ধূসর পান্ডুলিপি” থেকেই জীবনানন্দ নিজেও তাঁর কবিতায় বারবার অস্তিত্ব আর ভালোবাসার মাঝে প্রেমে অস্থিরতা আর প্রেয়সীর অমিলনের মত কিছু ভিসুয়াল ন্যারেটিভকে যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন। “ধূসর পান্ডুলিপি”র প্রথম কবিতা “নির্জন স্বাক্ষর” এর শুরুতেই কবি লিখলেন-





“তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে-


আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে!


যখন ঝরিয়া যাবে হেমন্তের ঝড়ে,


পথের পাতার মতো তুমিও তখন


আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?”





কিংবা “ধুসর পান্ডুলিপি”-র '১৩৩৩' কবিতায় জীবনানন্দ আগত অনাগত আবহমানের কালের মাঝে পরিকীর্ণ ধ্বংসস্তুপের মত দাঁড়িয়ে তাঁর অনুল্লেখিত প্রেয়সীর প্রতি  লিখলেন নৈঃশব্দ্যের কিছু দ্যোতনাবাহী শব্দ; কবিতার ভেতর থেকে উঁকি দিল হাওয়া বাতাসের পথে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো অনুপস্থিতি আর অপেক্ষার ভারী ও ভরশূন্য ছায়া। নিজেরই অতীত পর্যায়গুলি যেন কবিতার প্রতিটি ধ্বনি হয়ে উঠল সেখানে, যেখানে অতল ও সমাধানহীন সেই স্মৃতি যার প্রশ্ন ছাড়া, প্রলম্বিত অপেক্ষা ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। যে কেবল চিরায়িত কিছু পরমতার আশায় আশায় বসে থাকে আর উচ্চারণ করে-





“কত দেহ এল, গেল, হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে


দিয়েছি ফিরায়ে সব-সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে


নক্ষত্রের তলে


বসে আছি-সমুদ্রের জলে


দেহ ধুয়ে নিয়া 


তুমি কি আসিবে কাছে প্রিয়া ! “


...


......


কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার কেবল ব্যাকুলভাবে এই প্রশ্নই নয়, একই কবিতার অন্য পংক্তিতে জীবনানন্দ নিজেই উত্তর ছুঁড়ে দিয়েছেন নিজের তৃষিত জীবনবোধির প্রেক্ষিতে। যেখানে কবি বুঝে গেছেন এই আঁকড়ানো মিথ্যে, এই দুঃখ সইতে হবে, এই অপেক্ষার নালিশ কোথাও পৌঁছোবে না, শব্দের ব্যাস্তবাগীশ মেঘের মধ্যে কোথাও নৈঃশব্দ্যের বৃষ্টি ধরবে বলেও আর আশা নেই আর তাই যেন তিনি চিরবাঞ্চিত অপেক্ষার পরিণতিটুকুও জেনে গেছেন। আর এখানেই একই কবিতায় প্রেয়সীর প্রতি অপেক্ষারত কবিকে প্রেত তাড়িতের মত প্রেমের কালেকটিভ আনকনসাসনেস থেকে বেরিয়ে আসতে দেখি আমরা। যেন এই অপেক্ষার কাছে বিরহের কাছেও থিতু হতে পারল না তাঁর কবিতা, ভেসে গেল অন্য এক একটানা জলের শব্দে, যেখানে পথ চলার পিপাসা হারিয়ে গেছে, থেমে গেছে ভালোবাসা, ‘প্রেম’-‘অপেক্ষা’র মত উত্তেজনা উৎসাহের মত শব্দগুলিকে কেটে জায়গা দখল করে নিয়েছে নতুন শব্দ, যাপনের নতুন পংক্তি- সেখানে অসহায়তার বদলে স্থিরতা, শূন্যতার নিরুচ্চার অভিমানের বদলে সত্যকে মেনে নেওয়ার সংজ্ঞা যেন পেয়ে গেছেন কবি। প্রেমের মত বিষাদও তো জৈব প্রার্থনা আর এই জৈবতা অতিরিক্ত চিরন্তনতার দিকেই কবি পেলেন প্রবাহমান জীবনের অপর এক খন্ড মুর্হুত; লিখলেন-   





“জানি আমি, খুঁজিবে না আজিকে আমারে


তুমি আর; নক্ষত্রের পারে


যদি আমি চলে যাই,


পৃথিবীর ধুলো মাটি কাঁকরে হারাই


যদি আমি-


আমারে খুঁজিতে তবু আসিবে না আজ;''


......


......


অথচ এখানেও শেষ নয়। আবার বিস্ময়বোধক চিহ্নের সামনে তাঁর চেতনকণাকে নিয়ে ফিরে এলেন কবি, বাস্তব ও কল্পনার সংশয়ই যেন তাঁর কবিতার মূল কথা হয়ে উঠল। লোকের মধ্যে যেমন আলোকের ব্যঞ্জনা যা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়বে ঠিক একইভাবে জীবনানন্দের প্রেমের কবিতায় বারবার পারমার্থিক থেকে একধরনের পিছুটান ঘুরে ঘুরে আসছে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যষ্টিজগতের অনুতে তনুতে, আঁতিপাতি খুঁজছে কবিকে পাঠককে প্রেয়সীকে, যা ব্যথাতে বেদনাতে মিলিয়ে যাচ্ছে তাই আবার পরক্ষণে ব্যথা ফুঁড়ে গজিয়ে উঠছে নতুন কোনো সুদর্শনার বনলতার বুকে। '১৩৩৩' কবিতার অন্য পংক্তিতে নিষ্ক্রমণ থেকে পুনরাবর্তনের এই মিক্সড ভিস্যুয়ালটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কবি যখন লেখেন- 





“তুমি যদি রহিতে দাঁড়ায়ে !


নক্ষত্র সরিয়া যায়, তবু যদি তোমার দু-পায়ে


হারায়ে ফেলিতে পথ-চলার পিপাসা!


একবার ভালোবেসে-যদি ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালোবাসা ।


আমার এখানে এসে যেতে যদি থামি !-''   





আসলে একেবারে শুরুর থেকে জীবনানন্দের কবিতায় প্রেম শব্দের প্রতি রয়ে গেছে এমনই সব সংশয় এমনই সব দ্বিধা, যাকে আমরা বেদনা নাম দিয়েছি সে কিন্তু বাড়ি ফিরতে চেয়েছে বারবার, ফিরতে চেয়েছে পাতাপতঙ্গের কাছে, বিশ্বপ্রবাহের কাছে তার আকাঙ্খা উচ্চারিত হয়েছে অনুচ্চার কিছু উপলব্ধিতে। যার অতলে তলিয়ে গেছেন তিনি বারবার, যার স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতির সাথে নিজস্বতাকে মিশিয়ে নিয়েছেন আশ্চর্য সজীবতায়। তাই তাঁর কবিতায় গড়ে উঠেছে একধরনের প্রবহমানতা, যা সময়হীন, বোধের দিকে থেকে এবং বয়নের দিক থেকেও যা ক্রমসম্ভাবনায় জারিত। কখনই সে প্রেমের একপেশে ধূসরতর রূপক চিত্রীকরণ সম্ভব নয়। ইদানীন্তনকালে জীবনানন্দ গবেষক হিসেবে একমাত্র প্রাবন্ধিক গোপালচন্দ্র রায়কেই দেখি জীবনানন্দীয় প্রেমকে বিরহ বেদনার মত কোনো নির্দিষ্ট মান্যতায় না বেঁধে একাধিক মনোবীজ দিতে। তিনি সরাসরি জীবনানন্দের প্রেমের কবিতাকে সাতটি ভাগে ভাগ করেছেন-


১)- কোনো নারীকে দেখে তার উপর লেখা কবিতা। এটা কতকটা পূর্বরাগের কবিতার মতন।


২)- সফল প্রেমের বা মিলনের কবিতা।


৩)- প্রেয়সীর চিঠি পেয়ে তার উপর লেখা কবিতা।


৪)- প্রৌঢ বয়সের প্রেম সম্বন্ধে লেখা কবিতা।


৫)- ব্যর্থ প্রেমের কবিতা।


৬)- মৃতা-প্রেয়সীর উপর লেখা কবিতা।


৭)- অপরের- তা সে মানুষই হোক বা পশুপক্ষীই হোক বা অন্যান্যই হোক, তাদের প্রেম নিয়ে লেখা কবিতা। 


তবে অল্পবিস্তর বিরহ সংযোজিত হয়েছে বেশীরভাগ প্রেমের কবিতাতেই, বনলতা মর্ত্যনারী হয়েও হয়ত এই বিরহ ব্যাথা বেদনা অভিমানই তাকে করে তুলেছে নারী থেকে মানবী। যে মর্ত্যমুখীন হয়েও ইন্দ্রিয়জ নয় ; বনলতার বিরহে জীবনানন্দের চেতনা তাই ক্লান্তি থেকে প্রশান্তিতে সঞ্চারিত হয়েছে গভীর বিস্ময়বোধের সাথে। বনলতার পাশে এসে বসলে মাঝে মাঝেই আমাদের মনে হতে থাকে বনলতা কি সেই জীবনের প্রতীক ‘যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের, যে জীবনের সঙ্গে মানুষের দেখা হয় না’ ! তাই কি নীরাকে না পাওয়ার আকাঙ্খা যেমন সুনীল নীরার মধ্যেই পেতে চেয়েছেন অপেক্ষা করতে চেয়েছেন নীরা নাম্নি একজন নারীর কোলে অবোধ শিশুর মত মুখ ঘষে, একটি মানুষের করতল একটি মানুষের মাথায় ঠেকিয়ে তেমনি জীবনানন্দ বনলতাকে না পাওয়ার বেদনা ভুলতে এই জীবনকে ফিরে পেতে চেয়েছেন কোনও ঘাসের আদলে কোনও বনহংসের আদলে কিংবা নিদেন পক্ষে এক হিম কমলালেবুর করুণ মাংসের আদলে! প্রাত্যহিকতার স্থূল প্রাপ্তি থেকে এখানেই বোধহয় বনলতা  বিধিনিষেধহীন হয়ে গেছে প্রতিপক্ষহীন হয়ে গেছে। জীবনানন্দ বেদনা থেকে বনলতাকে নিয়ে বিদেহে যাত্রারম্ভ করেছেন যেমন তেমনি পাঠক সাক্ষী হয়েছে অপ্রাণের ভেতর প্রাণের অতিক্রমণের। নীরা সেখানে লীনচিত্ত হয়ে আছে একটি মধ্যবিত্ত ডিসর্কোসে...




আমরা সরাসরি নীরা বা বনলতার মত চরিত্রদের ব্যক্তিমাত্রিক টেক্সট এবং একই সাথে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠার দোলাচলগুলোকে প্রেম বা প্রণয়ের একাধিক বাহ্যপ্রতক্ষ্যতার সাথে সহজেই মিলিয়ে নিতে পারি। একটি সাধারণ জৈব প্রেমে যে তীব্র ইচ্ছা আশা আকাঙ্খার মত প্রত্যক্ষ বোধ তার সাথে এ চিরকালীন চরিত্রগুলি কতটা দ্রাব্য কতটাই বা সে কবির মানসপ্রতক্ষ্যতার হাঁড়ি ভেঙে ঢুকে পড়ে আমাদের প্রাত্যহিক হেঁসেলে সেই সহজ সমীকরণটিকেই একটি দীন পাঠকের ভূগোলে প্রতিনির্মিত করতে পারি। এখন প্রশ্ন আত্মরসের সাথে প্রীতরসের মিলনে একটি  সাধারন প্রেমে কি থাকে? নিকটতা, বিরহ, ব্যর্থতা, অভিমান, স্মৃতি কিংবা শান্তির মত একাধিক স্পন্দনবোধ একাধিক সংবেদন। বিরহ বা নিকটতার কথা এবং তাদের পারস্পরিক ধ্রুপদী আঙ্গিকের পারস্পরিক তুল্যমুল্যতা পূর্বেই আলোচিত এবং তা থেকে সহজেই অনুমেয় নিত্যকালের প্রেক্ষিতে ছয় দশক পরেও আজও কেন চরিত্রগুলি বাংলা সাহিত্যে অভিনব এবং পাঠক আদৃত।  





আবার অভিমানের মত প্রেমের সচেতন ন্যারেটিভটিকে নিয়ে কথা বললে বলতে হয় অভিমান নীরা ও বনলতাকে একাধিক মাত্রাযোজনা দিয়েছে; কেবল চরিত্র নয় পাশে দাঁড়ানো ছায়ার প্রতিও অভিমানের সুর বেজেছে বারবার। প্রেয়সীর অবর্তমানে কেবল বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে বসে থাকা নয় বরং তাঁর নিজস্ব প্রেমের পেরিফেরিতে অন্য প্রেমিকের অনুপ্রবেশটিকেও বাকস্থাপত্যে তুলে এনেছেন জীবনানন্দ বা সুনীল। হিংসে করেছেন অভিমান করেছেন নতুন প্রেমিকের উপস্থিতিকে। “আকাশলীনা” কবিতায় জীবনানন্দ সুরঞ্জনাকে উদ্দেশ্য করে লিখলেন- “সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো নাকো তুমি/বোলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে/ফিরে এসো সুরঞ্জনা”-‘অই’ যুবকটির প্রতি প্রতিদ্বন্ধীতার চেয়েও এখানে জীবনানন্দের নিজের প্রেয়সীর প্রতি অভিমান চোখে পড়ার মত। ‘ফিরে এসো’-পংক্তিপ্রান্তিক এমন আকুতিতে যেন অনাদৃত পরিত্যক্ত এক প্রেমিক বারবার প্রেমের প্রথাগত সেন্টিমেন্টের কাছে ফিরে ফিরে আসছেন। প্রাবন্ধিক গোপালচন্দ্র রায়ও তাঁর আলোচনায় লিখছেন-“জীবনানন্দের ব্যর্থ প্রেমের কবিতাগুলিতে একটা বড় জিনিস লক্ষ্য করা যায় এই যে, যেখানে কবির প্রেয়সী কবিকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করছে, বা অন্য পুরুষকে ভালোবাসছে- কবি এ কথা জেনেও এমন কি দেখেও প্রেয়সীর প্রতি রাগে ফেটে পড়েননি। আর কবি তাঁর প্রেমের প্রতিদ্বন্ধীর উপরও ক্রোধ প্রকাশ করেননি। এমন কি এজন্য নিজের মনেও তেমন কোনো জ্বালা অনুভব করেননি” -কিন্তু গোপালচন্দ্র রায়ের এই শেষোক্ত উক্তিটিকেও আমি সর্বতসত্য বলে মনে করি না কারণ প্রেমের প্রতিদ্বন্ধীর উপর জ্বালা না থাকলেও “বনলতা সেন” গ্রন্থের “হায় চিল’ কবিতাতেই প্রেয়সীর অভাবে কবি ক্ষোভে ফেটে না পড়লেও প্রিয়তার ব্যঞ্জনাময় সুরই ধরা পড়ে। সে জ্বালা হয়ত জীবনানন্দের নিজের প্রতি কিন্তু ভিজে মেঘের কোনো দুপুরে একটি সোনালি ডানার চিলকে দেখে জীবনানন্দ যখন বলেন- “তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে/ পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;/ আবার তাহারে কেন ডেকে আন? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?” –তখন ওই চিলের ডানায় উড়ে আসা সূদূর শূন্যতার সাথে কবি যেন স্বেচ্ছায় জড়িয়ে দেন হৃদয়ের শব্দহীন সবটুকু জ্বালাকেই।এখানে হয়ত সরাসরি কোনো দ্বিতীয় প্রেমিকের উপস্থিতি নেই বা মৃত্যু প্রত্যয়ের ওপার থেকে সম্পূর্ণ চিত্রকল্পটি ফিরে ফিরে আসছে কিন্তু খানিকটা ফাঁকার ভেতরেও  তা যেন বয়ে আনছে জীবনকল্পের অভিমানী স্বর। পাশাপাশি সুনীল নীরার মধ্যে অভিমানের ইনডিকেটিভ মুডটিকে সে অর্থে বিশেষ আধিবিদ্যিক বৈভব দেননি বরং তার ভাষা গভীরভাবে অস্তিবাদী, তার উপস্থিতি অনুপস্থিতির সাথে একজন কবির চেতনাকণার থেকেও জোরদার হয়ে ওঠে একজন সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট। যেমন “ছায়া” কবিতায় সুনীল লিখলেন-





“হিরন্ময়, তুমি নীরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ো না,


আমি পছন্দ করি না


পাশে দাঁড়িয়ো না, আমি পছন্দ করি না


তুমি নীরার ছায়াকে আদর করো।


হিরন্ময়, তোমার দিব্য বিভা নেই, জামায় একটা


বোতাম নেই, ছুরিতে হাতল নেই,


শরীরে এত ঘাম, রক্তে এত হর্ষ,


চোখে অস্থিরতা


এ কোন ঘাতকের বেশে তুমি দাঁড়িয়েছো?


ঘাতক হওয়া তোমাকে মানায় না


তুমি বরং প্রেমিক হও


সামনে দাঁড়িয়ো না, পাশে এসো না


তুমি নীরার ছায়াকে মুখ চুম্বন করো...।''





কোনো পরাস্নায়ুবিক খোঁজ নয়, কোনো সুররিয়ালিস্টিক অতিসংযোজনা নয় বরং সুনীলের নীরার পাশে যে সুনীল দাঁড়িয়ে সে একজন শ্লথ শ্বাসের দৈনন্দিন মানুষ যার জুতোর স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে যায়, উবু হয়ে বসে রাস্তার মুচির কাছে, যে মানুষের সভ্যতা ভালোবেসেও বাথরুমে মুখ ধুতে গিয়ে কাঁদে একা একা। এই সেই সুনীল যে নীরার সামনে হিরন্ময় নামের চরিত্রকে স্থাপন করলেন হিরন্ময়কে খুঁজতে নয় বরং মূল প্রেমিকের চিৎকারকে আরও উন্মুখর করতে, অতিপরিচিত এক মানুষের চরিত্র চিত্রায়ন এই হিরন্ময়ের আদলে আর হিরন্ময় সেই মাধ্যম যাকে আঘাতের মাধ্যমে কবি নিজেরই পুর্নবাসন চাইছেন তাঁর নীরার কাছে। ফলে নীরার কাছে কবির অভিমান যতটা না কবিতার মন্তাজ তার চেয়েও ঢের বেশী মানুষের মনোলগ যার প্রতিটি চুন বালি ছোপ শ্যাওলার সাথে অস্তির অমোঘ উচ্চারণ। পাশাপাশি নীরাকে যেমন সুনীল পবিত্র সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, এক চিরস্থায়ী মানসিক শুভ্রতার সপক্ষে সরাসরি উচ্চারণ করেছেন-





এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ


       আমি কি এ হাতে  আর কোনোদিন


                              পাপ করতে পারি?


এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি-


এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?





ঠিক তেমনি বনলতা চরিত্রটিকে একাধারে ‘সেন’ উপাধি বেষ্টিত করে জীবনানন্দ যেমন তার মাঝে একটি মানবীয় নির্মোক বয়ন করতে চেয়েছিলেন ঠিক তেমনি তার প্রেমউপাদানের প্রতীকি অন্তরালে কোথাও যেন নিমজ্জিত হতে চেয়েছিলেন জীবনের শুদ্ধতায়, জীবন প্রবাহে খুঁজে ফিরছিলেন সেই নিরবিছিন্ন শান্তিটি, তাই তো ‘তোমাকে’ কবিতায় কবিকে প্রণয়োল্লাস পেরিয়ে প্রশান্তির স্নিগ্ধ স্থিতধীর কথা বলতে শুনি- “তোমার বুকের পর আমাদের পৃথিবীর অমোঘ সকাল/ তোমার বুকের পরে আমাদের বিকেলের রক্তিল বিন্যাস/তোমার বুকের পরে আমাদের পৃথিবীর রাত”...।





নীরা ‘আবেগের অজস্রতা ও প্রগলভতা আদৃত’ অথচ বনলতা যেন প্রাচীন কোনো ঠাসবুনোট সময়হীন সম্বোধন। “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে”- বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতার শুরুতেই জীবনানন্দ আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন এক শাশ্বত সময়কালে। নাটোরের বনলতা যেন এই মহাসময়ের মধ্যে কেবল একটি সংযোগসুতো, প্রেম নামের একটি আবহমান টেম্পেরার সাথে যার মূলতন্ত্রীটি বাঁধা। বনলতা সেন প্রসঙ্গে শামসুর রহমানের কথায়- “সময়হীনতায় পাঠককে স্থাপন করেছেন জীবনানন্দ। যে ক্লান্তপ্রাণ পথিকের কথা বলা হয়েছে সে কোনো বিশেষ কালের নয়, সে সর্বকালের। এই পথিকটি বিম্বিসার, অশোকের ধূসর জগতে এবং আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে পথ হেঁটেছে। কিন্তু তাকে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। সেকাল এবং একালের মধ্যে একটা যোগসূত্র রচনা করেন নাটোর এবং বনলতা সেন। এখানে কবি শুধু রূপ সৃষ্টিই করেননি, তাঁর গভীর ইতিহাসচেতনারও পরিচয় দিয়েছেন।''- আর সাময়িক থেকে শাশ্বতের সন্ধানী ছিলেন জীবনানন্দ নিজেই। তাঁর ‘কবিতার কথা’ –য় কবির ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-“যে সময়ে সে বাস করেছে এবং যে সময়ে বাস করেনি, যে সমাজে সে কাল কাটাচ্ছে এবং যেখানে কাটায়নি, যে ঐতিহ্যে সে আছে এবং যেখানে সে নেই –এই সকলের কাছেই সে ঋনী।'' নীরা আর বনলতা চরিত্র দুটিকে পাশাপাশি রেখে তাদের নিরন্তর ছড়িয়ে ছিটিয়ে গুটিয়ে আনলেই দেখা যাবে জীবননান্দ কোথাও বনলতার মত প্রেয়সীর মধ্য দিয়ে মহাকবিতার খোঁজ করেছিলেন যেখানে নীরা সুনীল ও তাঁর সামগ্রিক প্রেমকে প্রতিস্থাপিত করে গেছে একটি সাধারণ মানুষের স্নায়ব সংকলনের কাছে। সে মানুষ জন্ম নেয় বারবার আর্তনাদ অভিমান আনন্দের মত জাগ্রত জীবনের প্রশ্নগুলির কোনো স্থির উত্তর না পেয়ে; এই প্রবহমান সংশয় ও বহুকালের চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসের থেকে সে বেরুবার পথ পায় না। নীরার মধ্যে দিয়ে সুনীল যেন ক্ষণকালের অস্তিবাচক তাৎপর্যে নিজেকে বারংবার নির্মাণ বিনির্মাণ করে যেতে চেয়েছিলেন। হৃদপিন্ডের উপদ্রবে যেখানে চরিত্র অবিনশ্বরের থেকেও নশ্বরকে তার প্রবহমান জীবনসত্য করে তোলে।বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতায় প্রণয়রসে ভরপুর হলেও সেখানে ধ্বনিত হয়েছে চিরন্তরতার কথা। কবির নিজের ভাষায় ‘হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে ক্রমে সেখানে মানুষ/ আশ্বাস খুঁজছে এসে”। কি এই আশ্বাস? “জীবনানন্দের চেতনাজগত” থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করে বলা যায়-“মানুষের মনোজগতে ভালবাসার জন্মমৃত্যুর চঞ্চল নশ্বরতার পাশে প্রকৃতির শান্তি ও সান্ত্বনার অপরিবর্তনীয় আশ্বাসের বানী উঁকি দিয়ে যায়। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের ‘দুজন’ কবিতার নায়িকা যখন লে ওঠেন –‘আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না/হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের’- কিম্বা তাঁর প্রেমিকের যখন মনে হয় ‘ এই নারী অপরূপ- খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে’ যেখানে ‘অমৃতের হরিনীর ভিড় থেকে ঈপ্সিতাকে’ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তাদের কন্ঠে ধ্বনিত হয় প্রেমের সেই চিরন্তন দিব্যতার আদর্শ যা এক অপ্রাপনীয়ের সৌন্দর্যমূর্তি ঘিরে উৎসারিত হয়েছে রোমান্টিক কাব্যের দেশকালনিরপেক্ষ সম্ভারে”... 





আসলে “নীরা” ও “বনলতা”র মাঝে এখানে আঙ্গিক নিয়ে কাঁটাছেঁড়া নয় বরং তাদের চেতনার নবীনতাই আমাদের বিচার্য। ঠিক যেমন নন্দলাল বসু বলতেন-“রস চিরকালই এক, কিন্তু নানা শিল্পী তা নানাভাবে প্রকাশ করেছেন আর তাতেই আনন্দ। প্রত্যেক শিল্পীর গন্তব্যস্থানে যাওয়ার পথ স্বতন্ত্র। তবে চলার পথ এক না হলেও তা থেকে চলার ইঙ্গিত পাওয়া যেতেই পারে” – আর ঠিক একই কথা প্রযোজ্য ‘নীরা’ বা ‘বনলতা”র স্রষ্টাদের প্রতিও। এতদিন বাদে তাদের টেকসট তাদের ন্যারেটিভ তাদের আর্কিটেকচার নিয়ে যে দু একটি কথা যা বলার তা হয়ত বলা হয়ে গেছে অনেক আগেই, তবু আমরা আজও সাহস দেখাই চলমান জীবনপ্রবাহে বনলতা বা নীরার হাত ধরে টেনে আনার; অবচেতনার থেকে যে জেগে উঠেছিল সেই একজন সামান্য পাঠকের চেতনার রাজত্বে প্রতিনিয়ত সন্মোহ মিশিয়ে যায়। মনে হয় সে আমাদের,  মানুষের গভীর মনস্তত্ত্ব অবধি যেন এসব মানবীদের অনুভব করতে পারি আমরা। মাঝেমাঝে মনে হয় এরা কি কোনো স্মৃতিমেদুর কাল্পনিক নাম নাকি বনলতা জীবনানন্দের ব্যক্তি জীবনের সাথে সম্পর্কিত কিংবা নীরা সুনীলের ? না হলে বনলতা সেন গ্রন্থের “আমাকে তুমি” কবিতায় কবি কেন লিখলেন- “আমাকে/ তুমি দেখিয়েছিলে একদিন; মস্ত বড়ো ময়দান-দেবদারু পামের নিবিড় মাথা-মাইলের পর মাইল;/ দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস” কিংবা “শঙ্খমালা” কবিতার প্রথমেই কবি লিখলেন- “কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে/ সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,/বলিল, তোমারে চাই” । কিংবা ‘বনলতা সেন’ কাব্য গ্রন্থেরই “অঘ্রাণ প্রান্তরে” কবিতায় এসে জীবনানন্দ প্রেয়সীর অসাক্ষাতে বিচলিত হয়ে লিখলেন-


“আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন- কতদিন আমিও তোমাকে


খুঁজি নাকো- এক নক্ষত্রের নিচে তবু- একই আলো পৃথিবীর পরে


আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরোনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,


প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়


হয় নাকি?-বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে”





খুব সহজেই বোঝা যায় এই কবিতায় এক প্রৌঢ় প্রেমিক ও প্রেমিকাকে দিয়ে তার মনের কথা বলিয়েছেন কবি। ‘আমি’কে প্রতিস্থাপিত করেছেন এক অমর প্রেম কাব্যের মাঝে।  জীবনের শেষভাগে এসে সে প্রেমের তলদেশে পুঁতে রাখা শুভ্রতা আর স্তব্ধতাকে নিয়েই কবির আকুতি। এসব পংক্তি দেখে মনে হয় কবি যেন তাকে দেখেছিলেন পেয়েছিলেন ছুঁয়েছিলেন অন্তত একবার, নাহলে কেনই বা “শঙ্খমালা” কবিতার শেষ পংক্তিতে তিনি লিখবেন-“ চোখে তার /যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার/ এ পৃথিবী একবার পায় তাকে, পায় নাকো আর।'' আবার সুনীল তো নীরাকে একেবারে প্রতিদিনের সাদা কালো ড্যাশ কমা কোলনে বেঁধেছেন। কোনো অচেনা জায়গা নয় বরং নীরাকে নিয়ে তাঁর জন্ম বদলের দিনগুলো দক্ষিনেশ্বর ব্রীজের ওপর থেকে হরি ঘোষ স্ট্রীটের কদমগাছটি অবধি সুদীর্ঘ সময়কালকে কুড়োতে কুড়োতে এগিয়েছে। তাঁর প্রতিটি যাপনে সরাসরি নীরার জাল ফেলার শব্দ, নীরার জৈবিক যোগাযোগ। তাই তো নীরাকে নিয়ে তাঁর অসংখ্য কবিতার মধ্যে মানসভ্রমণ অপেক্ষা দৃষ্টিমন্থিত ডকুমেন্টেশনগুলোর বরাদ্দ বেশি। তাই তো নীরার জীবন্ত নড়াচাড়ার পাশে কবিতা খোঁজেন সুনীল। অনায়াসে লিখে ফেলেন-





“কখনো আমি নীরবতা, কখনো আমিই গর্জন


তুমি অন্ধ বৃদ্ধকে পয়সা দিলে শিয়ালদার ঘড়িটি থেমে গেল


ট্রেন থেকে নেমে এত মানুষ দৌড়চ্ছে, সবাই থমকে গেল কয়েক মুর্হুত


............।


...............


তুমি পরীক্ষার হলে একা  বসে রইলে, প্রশ্নপত্র এলো না


আমি নিচু হয়ে খুঁজেছি ফুটো পকেটের খুচরো পয়সা,


তুমি কুসুম সমারোহে গিয়ে পতাকার মতন উড়িয়ে দিলে আঁচল


আমি সারা সন্ধে শুয়ে রইলুম শ্মশানের পাশে ...”





অর্থাৎ একদিকে আমাদের মনে হতে থাকে বনলতা বাস্তবেরই কেউ একজন, নীরা বাস্তবের কেউ একজন, এই বিশ্বআবর্তনের মাঝে প্রতিমূর্হুতের হয়ে সে আছে, তার চরিত্র চলমানতা চালচিত্রটি কবি কুড়িয়ে রাখছেন কোনো এক অঘ্রাণের অন্ধকারে। কিন্তু এ তো সত্য নয়, সত্যের মত এক আপেক্ষিক কল্পনার সংমিশ্রণে উদ্ভুত ছবিমাত্র, না হলে এই বনলতার চোখ কিভাবে ‘বেতের ফলের মত নীলাভ ব্যথিত' হয়ে ওঠে! কিভাবেই বা ‘বিমর্ষ পাখির রং-এ ভরে ওঠে তার দেহ? কিংবা সুনীল তো নিজেই নীরাকে আমাদের এই পরিচিত সময়স্রোতের মাঝে অবিমিশ্র একটি অধরা করে রাখলেন, তাকে ডাকবার কথা ভাবা গেলেও ধরবার কথা যেন ভাবা যায় না- ঘূর্ণায়মান আস্তিকতায় প্রতিমুহুর্তের দৌড় যেন নীরা, একটি অনিবার্য না-ছোঁওয়া- না হলে কবি কেন বলবেন-





“অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো


আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতা পাতা


ও যে বহুদূর,


পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর


ওখানে কী করে যাবো, কী করে নীরাকে


খুঁজে পাবো?...”





সৃষ্টি কালোর্ত্তীণ হলে চরিত্রদের ছোঁওয়া না ছোঁওয়ার এ টানাপোড়েন চলবেই, তবে তার আগে জেনে নেওয়া দরকার নীরা বা বনলতা চরিত্রগুলি কেন যুগযুগান্তরের শেষেও কেন যুগোর্ত্তীণ কেন আজও এযুগের মনে হয় ! কেন  কাব্যিক নির্বাচনের গুনে তারা সহস্রধা দৃষ্টির এক দৃষ্টি হয়েও উৎকর্ষতার শেষ নীড়ে পৌঁছেও আজও পাঠকের প্রধান নির্ভরস্থল ! তার প্রধান কারণ মানুষের ত্রিধাবৃত্তি অর্থাৎ চিন্তা অনুভব আর সংকল্পের হাত ধরে যে জটিল রহস্যময় অন্বেষনায় পৌঁছতে চায় মানুষের মন, সেখানে প্রেম হল সেই প্রাথমিক আবেদন যা জীবানুভূতির ভাষাকে জীবন্ত করে তোলে। জন্ম থেকে মৃত্যু এই একটিমাত্র ল্যান্ডমাইন পোঁতা প্রতিমুর্হুতে যার বিস্ফোরণ টের পায় হৃদয়ের প্রত্যন্ত এলাকাও। আসলে ভালোবাসার যেকোনো সমীকরণই মানুষের সমীকরণ, তার বেঁচে থাকার সাথে তার উপলব্ধির সাথে তা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এমনকি জীবনের প্রান্ত সীমার সাথে এতটাই আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা এই ভালোবাসা প্রেম প্রণয় শব্দবন্ধগুলি যে যাপনের প্রতিটি উৎকন্ঠাও পরিকীর্ণ হয়ে আছে প্রেমের ‘প্রাতিস্বিক গুনগুনে’। শুরু থেকেই মানুষের জন্ম না চেয়ে পাওয়া, মৃত্যুও না চেয়ে পাওয়া আর এর মাঝে মানুষের একা থাকার যে অসহায়তা হয়ত তাই থেকেই প্রেমের আকুতি, কিছু একটা আঁকড়ে ধরার আদিমতা। বনলতা বা নীরার মধ্যে দিয়ে জীবনানন্দ বা সুনীলও কিন্তু  এই আঁকড়ে ধরতেই চেয়েছিলেন নান্দনিক শৈলীর ছন্দে যে মুর্হুত থেকে মানুষ জানে তার চারদিকের এই থাকার কোনোটাই আসলে থাকা নয়, কেবল দলে দলে এগিয়ে আসছে প্রতিমুর্হুতের এক না-থাকা সেই একাকীত্ব সেই বিচ্ছেদের ভাবনাই মানুষকে প্রেমের কাছে অকপট প্রার্থনা করতে শিখিয়েছে। আর জীবনানন্দ সুনীল দুজনেই কোথাও নীরা বা বনলতা চরিত্রায়নে এই না-থাকার থাকাটুকুকেই যুগান্তকারী সংবেদনশীলতা দিয়েছেন। একেবারে শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়েও শেষ অবধি প্রার্থণা করে গেছেন- “ফিরে এসো, ফিরে এসো তুমি/ তোমাকে আমার কিংবা আমাকে তোমার কোনো/ নির্বাসন নেই/ ফিরে এসো, এই বাহুঘেরে ফিরে এসো!...”- “আর্ট অফ লাভিং”-এ যেমন এরিচ ফ্রোম বলেন-“Man of all ages and cultures-is confronted with the solution of one and the same question; the question of how to overcome separations, how to achieve union, how to transcend one’s own individual life and final at-onement. The question is the same for primitive man living in caves, for nomadic man taking care of his flocks, for the peasant in Egypt, the Phoenician trader, the Roman soldier, the medieval monk, the Japanese samurai, the modern clerk and factory hand. The question is the same,-জীবনের এই নিঃসঙ্গতার কাছে এসে আমাদের কবিও যে এক দোহাট দরজা খুঁজে বেড়াচ্ছেন, নীরা বা বনলতার মত চরিত্র চিত্রনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর সমীকরণে দাঁড়ানো একা মানুষের কাছে পৌঁছতে চাইছেন যাকে ঘিরে প্রবহমান সময়ের ভেতর জারিত হতে থাকে ব্যক্তি মানুষের আশা আকাঙ্খা বিষাদ হর্ষ। জীবনানন্দ বা সুনীল তাদের চিত্রিত চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে যা করে গেছেন তা হল পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক রোদের উজ্জ্বলতা বা অনুজ্জলতানুযায়ী দৃশ্যমানের ভেতরকার সেই প্রচ্ছন্ন অদৃশ্যমানকে চাড়িয়ে দেওয়া।




একেবারে গোদা ভাষায় একে আমরা কবির কল্পনা বা প্রতীকের প্রকাশবেদনা বলে এড়িয়ে যেতে পারলেও কোথাও যেন জীবনানন্দের বনলতা বা সুনীলের নীরাকে আমরা কেবল কল্পনার হাতে ছেড়ে দিতে পারিনা। এ সেই পরাক দৃষ্টি যা পার্থিবের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় পরিমার্জনের প্রশ্নটিকে। সংহিতায় আছে-“সত্যেন মনসা দীধ্যানাঃ”-অর্থাৎ ধ্যান গভীর হলে ফোটে প্রজ্ঞাচক্ষু আর উপনিষদে তাকেই বলছে ‘প্রতিবোধ’ যেখানে উপাসক ধ্যান করেন চোখ দিয়ে আর চোখ শেষে চিত্তকে তলিয়ে দেয় হৃদয়ে। এই হৃদয়ে পাওয়াতেই বনলতা বা নীরার নন্দনতাত্ত্বিক সমীক্ষণ বেরিয়ে আসে। কে এই বনলতা কে এই নীরা –‘চোখে যার শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার’ কিংবা যে ‘সহাস্য নদীর জলের সবুজে মিশে থাকা দূরত্বের চেয়ে বহুদূর’ তাকে তো জীবনের আর্য প্রমাণ দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে না। এ প্রশ্ন ছিল এ প্রশ্ন থেকে যাবে। তবে কেন তাকে কবি আবিষ্কার করলেন! আবরন সরালেন আভরন দিলেন ! এ প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আগে আমাদের জানা উচিত বনলতা বা নীরার মত যুগান্তরী চরিত্রদের স্থাপনের মধ্যে একজন কবি কোন নেপথ্য অনুপ্রাণনার আমন্ত্রন পান? সুধীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন-“ মানুষের কান যে নিয়মে একটা সুপরিমিত শব্দপর্যায়ের উপরে-নিচে বধির, মানুষের চোখ যে নিয়মে একটা নির্দিষ্ট বর্ণস্তরের অধে-ঊর্ধ্বে অন্ধ, ঠিক তেমনই কোনও নিয়মেই মানুষের আবেগও একটা নাতিবৃহৎ আবগেগন্ডির বাহিরে নিষ্ক্রিয়”-জীবনানন্দ বা সুনীলের মত একজন কবি ঠিক এই বিন্দু থেকেই ইমেজের মধ্যে এনগ্রেভিং করতে থাকেন, দৃশ্য শ্রাব্য নামক মাধ্যমগুলিকে সংকেতমুক্ত করতে ক্রমাগত ক্রশ হ্যাচিং করতে থাকেন দৃশ্য শ্রাব্যের মত প্রাথমিক কারকগুলির।  এর ফলে শুরু হয় একধরনের পুনরুৎপাদন, দৃশ্যের প্রেক্ষিতে আরও বিনীত কোনো দৃশ্যের কিংবা শ্রাব্যের প্রেক্ষিতে আরও তীক্ষ্ণ কোনো শ্রোতের পুনঃ পুনঃ পুনরুৎপাদন। নীরা বা বনলতার মত নারী চরিত্র কেবল কাব্যিক প্রেমের প্রেয়সীর প্রতীক গুণে দ্যোতিত নয় বরং যে নীরা বা বনলতাকে সুনীল বা জীবনানন্দ আঁকলেন তার দিকে তাকিয়ে দেখলে সেও কি আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখে না? কথা বলে না আত্যন্তিক আপনতায়? এখানেই বনলতা বা নীরার চরিত্রচিত্রনের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইমেজগুলির প্রসঙ্গ উঠে আসে যা একজন পাঠককে প্রণয়ী বা প্রণয়ের প্রোটাগনিস্টের সাথে একাত্ব করে তোলে। সময় সংসার আর প্রকৃতির মধ্যেই তো বিধৃত ছিল নীরা বা বনলতা অথচ জীবনানন্দ বা সুনীল যেন তাঁদের শৈল্পিক খল নুড়িয়ে শিরিষ আঠা দিয়ে মোলায়েম বেটে আমাদের ক্ষণকালে মিশিয়ে দিলেন প্রণয়ের এমনতর চিরকালীন ভাষান্তর। যারা মানুষের উচ্চারিত সংলাপের থেকে নির্মিত হয়েও যারা কোনো এক নান্দনিক বিস্ময়ভূমির দিকে আজও ক্রমনির্মিয়মান। প্রেম যদি কেবল সহজেই দু'হাতের তালুবন্দী হয়ে যায় তবে তাতে অনেকক্ষণ আলো নিভিয়ে গল্প করার মত প্রতিবেদন থাকে না। আর অপ্রতিষ্ঠার মাঝেই যে প্রতিষ্ঠার চন্দনের গন্ধ ফলে এ জাতীয় প্রেমে যেমন একদিকে ফুসফুসচালিত পালমোনিক স্ট্রীম লেগে থাকে তেমনি একই সাথে প্রেমের প্রতিনন্দন হিসেবে গড়ে ওঠে একজাতীয় অবয়বহীন পরমের দিকে যাত্রা। অর্থাৎ একধরনের নিত্য চলমানতার আভাস থেকেই বনলতা থেকে নীরা চিরকালের হয়ে ওঠে। যে প্রেম শুধু প্রাপ্তির সে প্রেম যেন সীমিত সৌন্দর্যের, সেখানে নির্মাণ থাকলেও বিনির্মাণ নেই অনুসন্ধান নেই অপেক্ষা নেই, তার গণিত যেন অনিবার্য পরিণামে, সেখানে গতির আগ্রহ নেই। আর এখানেই নীরা ও বনলতার পারস্পরিক কোয়ালিটেটিভ ডিফারেন্সের বাইরেও প্রধান হয়ে ওঠে বাস্তব পরাবাস্তব অতিবাস্তবের মাঝে তাদের অদ্ভুত সহাবস্থানটি। তাদের নাটকীয়তা। তাদের চিত্রন। ইহজাগতিক অস্তির সাথে ইন্দ্রিয়সংবেদিতার এক নবমূল্যায়িত রসায়ন, যা আজও বাংলা কবিতায় গণসম্মোহনের দাবী রাখে...








____________________________________________


ঋণ স্বীকার – জীবনানন্দ (গোপালচন্দ্র রায়)/ জীবনানন্দের চেতনাজগত/জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থিত অগ্রন্থিত কবিতা সমগ্র- আবু হাসান শাহরিয়ার।